কক্সবাজার প্রতিনিধি: কুমিল্লার ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী জান্নাতুন তাজমীনকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। কক্সবাজারের কলাতলীতে একটি আবাসিক হোটেলে কথিত প্রেমিক রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে অবস্থান করেছিল তাজমীন। হোটেলের রেজিস্টারে তার নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’, বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। সেখানে রাজুর স্ত্রী পরিচয়ে কক্ষ ভাড়া নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের বরাতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তবে হোটেলে অবস্থান ও কক্সবাজার যাত্রার তথ্যের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়টি এক নয়। তাজমীন হত্যায় রাজুর কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে তাজমীন ও রাজু কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার কুটুমবাড়ি রোডের শেষ মাথায় অবস্থিত মেঘলা রিসোর্টের ৩০২ নম্বর কক্ষে ওঠেন। হোটেলের রেজিস্টারে তাজমীনের নাম ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স ১৮ বছর লেখা হয়। সেখানে রাজুর পরিচয় দেওয়া হয় বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে হিসেবে।
হোটেলের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এক রাত অবস্থানের পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তাঁরা হোটেল ছেড়ে চলে যান। রেজিস্টারে রাজুর মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত তথ্যও লেখা ছিল বলে জানান তিনি।
রাজুর এক সহকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাজমীনের সঙ্গে রাজুর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। তবে তাঁদের পরিচয়ের সময়কাল নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। একটি সূত্রের দাবি, পরিচয় হয়েছিল প্রায় পাঁচ মাস আগে; অন্য একটি সূত্র বলছে, ফেসবুকে পরিচয়ের পর মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।
রাজুর সহকর্মী জানান, তাজমীন হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশের পর রাজু নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন। হত্যার সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও তিনি দাবি করেন। ঘটনার পর থেকে রাজুর মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান ওই সহকর্মী।
কক্সবাজারের একটি ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ জানান, ৬ অক্টোবর রাতে তাজমীন ও রাজু তাঁদের কাউন্টারে গিয়ে কুমিল্লাগামী বাসের টিকিটের ব্যবস্থা করেন। পরদিন আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসে তাজমীনকে তুলে দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রাজুর ভাষ্য অনুযায়ী, বাসের টিকিটের দাম ছিল ৯০০ টাকা। তাঁর সহকর্মীর দাবি, রাজু নিজেই তাজমীনকে বাসে তুলে দেন। তবে বাসে ওঠার পর থেকে কুমিল্লায় পৌঁছানো পর্যন্ত কী ঘটেছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সিসিটিভি ফুটেজে ৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকায় হোটেল নূরজাহানের সামনে বাস থেকে তাজমীনের নামার দৃশ্য দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখান থেকে শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া তাজমীনকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমীনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
রাজুর এক সহকর্মীর দাবি, কুমিল্লায় ফেরার পথে অটোরিকশায় ওঠার পরও তাজমীনের সঙ্গে রাজুর মোবাইল ফোনে কথা হচ্ছিল। তাজমীন অটোরিকশাচালকের পরিচয় ও বিস্তারিত তথ্যও রাজুকে জানিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। রাত দেড়টার দিকে তাজমীনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে ওই সহকর্মী জানান।
তবে এসব বক্তব্যের সত্যতা ও ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্ক তদন্ত করে নিশ্চিত করতে হবে। লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, মোবাইল ফোনের কললিস্টসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার আরও তথ্য জানা যাবে।
তাজমীনের মা কেয়া খাতুনের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মেয়ে তাঁকে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু কার সঙ্গে ছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পেতে পারেননি তিনি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্ব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন বলেও জানান তিনি।
তাজমীনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, মেয়েটি ছিল চঞ্চল স্বভাবের। মায়ের অসুস্থতার সময় সে তার যমজ ছোট দুই ভাইয়ের দেখাশোনা করত। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন এবং মেয়েকে খুব আদর করতেন।
১৫ বছর বয়সী তাজমীনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার সব দিক নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।