সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি: কৃষিপণ্য, গবাদিপশু, বাঁশ-কাঠের সামগ্রী আর বালিশ মিষ্টির টানে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন ক্রেতারা, সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা ও কেনাকাটার ধরন। আধুনিক শপিংমল, সুপারশপ ও অনলাইন বাণিজ্যের প্রসার ঘটলেও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার কাইকারটেক হাট এখনও শত শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই হাট আজও স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। সপ্তাহের নির্ধারিত হাটের দিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ এখানে কেনাবেচার জন্য ভিড় করেন।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, মোগল আমলের শেষ দিকে নদীপথকেন্দ্রিক বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে কাইকারটেক হাটের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় কৃষক ও জেলেরা নৌকায় করে ধান, পাট, শাকসবজি, মাছ এবং গবাদিপশু নিয়ে এখানে আসতেন। সময়ের সঙ্গে হাটের পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে এর বাণিজ্যিক গুরুত্বও।
বর্তমানে সপ্তাহের নির্ধারিত দিনে ভোর থেকেই হাটে শুরু হয় বেচাকেনা। সূর্য ওঠার আগেই আশপাশের গ্রাম থেকে কৃষকেরা টাটকা শাকসবজি, ফলমূল, ধান, পাটসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য নিয়ে আসেন। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়তে থাকে মাছ, মাংস, গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগির বাজারে। হাটজুড়ে চলে দরদাম আর কেনাবেচার ব্যস্ততা।
কাইকারটেক হাটের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো গ্রামীণ জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা ধরনের পণ্যের সহজলভ্যতা। এখানে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি মোড়া, কুলা, ডালা, ঝুড়ি, চালুনি, মাছ ধরার ফাঁদ, কৃষিকাজের বিভিন্ন উপকরণসহ গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি হয়। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এসব পণ্যের ব্যবহার কিছুটা কমলেও গ্রামীণ জনপদে এগুলোর চাহিদা এখনও রয়েছে।
কৃষকদের জন্যও হাটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ফসলের উন্নতমানের বীজ, ফল ও সবজির চারা, রাসায়নিক ও জৈব সার, কীটনাশক এবং কৃষি উপকরণের দোকানগুলোতে দিনভর ভিড় দেখা যায়। স্থানীয় কৃষকেরা জানান, মৌসুমভেদে প্রয়োজনীয় অধিকাংশ কৃষি উপকরণ এক জায়গায় পাওয়ায় তাদের সময় ও খরচ-দুটিই সাশ্রয় হয়।
তবে কাইকারটেক হাটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে ঐতিহ্যবাহী বালিশ মিষ্টি। আকারে বড়, নরম এবং রসালো এই মিষ্টির সুনাম বহু বছর ধরে। স্থানীয় মিষ্টি ব্যবসায়ীরা জানান, হাটের দিনে শত শত কেজি বালিশ মিষ্টি বিক্রি হয়। অনেকেই আত্মীয়স্বজনের জন্য বা উপহার হিসেবে এই মিষ্টি কিনে নিয়ে যান। ফলে কাইকারটেক হাটে আসা অনেক দর্শনার্থীর জন্য বালিশ মিষ্টি কেনা যেন এক ধরনের অলিখিত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।
হাটে কেনাকাটা করতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল করিম বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই হাটে আসছি। এখনো প্রায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় জিনিস এক জায়গায় পাওয়া যায়। তাই কাইকারটেক হাটের গুরুত্ব আগের মতোই রয়েছে।”
আরেক ক্রেতা রওশন আরা বলেন, “এই হাটের বালিশ মিষ্টির স্বাদ আলাদা। হাটে এলে পরিবারের জন্য মিষ্টি না নিয়ে ফেরার কথা ভাবাই যায় না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. হাবিবুর রহমান বলেন, হাটের দিন আমাদের বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। শুধু স্থানীয় নয়, দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ কেনাকাটা করতে আসেন।
স্থানীয়দের মতে, কাইকারটেক হাট শুধু কেনাবেচার স্থান নয়, এটি সোনারগাঁর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই হাট এখনও স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ঐতিহ্য, বৈচিত্র্য এবং প্রাণচাঞ্চল্যের অনন্য সমন্বয়ে কাইকারটেক হাট আজও সোনারগাঁর অন্যতম দর্শনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ বাণিজ্যকেন্দ্র।