কুমিল্লা প্রতিনিধি : ফেসবুকে পরিচয়, এরপর ঘনিষ্ঠতা ও কক্সবাজারে দেখা করতে যাওয়া কুমিল্লার স্কুলছাত্রী জান্নাতুন তাজমীনের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে আসছে একের পর এক তথ্য। পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে কর্মরত রাজু চৌধুরীর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর তার সঙ্গে দেখা করতে সেখানে গিয়েছিল তাজমীন। তবে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়ার ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় সে।
রোববার (১১ অক্টোবর) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘিরে কুমিল্লায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত সুমন মিয়া আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তাজমীনের মা কেয়া খাতুন জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়। তখন তাজমীন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে তার বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি। এ জন্য বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমীন কিছু জানায়নি।
মেয়ের বন্ধুবান্ধব ও চলাফেরা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কোনো অঘটনের আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি তিনি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে সতর্ক নজর রাখার পরও শেষ পর্যন্ত তাকে রক্ষা করতে পারেননি বলে আক্ষেপ করেন তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ আগস্ট বাসা থেকে বের হয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায় তাজমীন। পরে কুমিল্লায় ফিরে আবার কক্সবাজারে যায় সে। মাকে জানিয়েছিল, বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছে।
কক্সবাজারে রাজুর সঙ্গে দেখা করার পর ৬ অক্টোবর রাতে দুজন কুমিল্লায় ফেরার বাসের টিকিট কাটতে যান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কক্সবাজারের কক্স প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ জানান, ওই দিন রাত ৮টার দিকে তাজমীন ও রাজু তাদের কাউন্টারে আসেন। পরদিন দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কুমিল্লার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
আবদুল্লাহ আরও জানান, বুধবার রাতে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানে তাজমীনের নামার দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া গেছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ফুটেজটি সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং পুলিশ চাইলে তা সরবরাহ করা হবে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা বাস থেকে পদুয়ারবাজারের হোটেল নূরজাহানে নামে তাজমীন। সেখান থেকে কুমিল্লা শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে সে।
পুলিশের অভিযোগ, অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। এ ঘটনায় সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাজমীনের মায়ের সন্দেহের তালিকায় থাকা ওই বান্ধবীর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পৃক্ততা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে রাজুর সঙ্গে তাজমীনের পরিচয়, কক্সবাজারে যাওয়া এবং ফেরার যাত্রাসহ ঘটনার পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাজমীনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, তাজমীন ছিল চঞ্চল স্বভাবের। মায়ের অসুস্থতার সময় সে তার যমজ ছোট দুই ভাইয়ের দেখাশোনা করত। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন এবং মেয়েকে খুব আদর করতেন। রাগ হলে তাজমীন কখনো কখনো হুট করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত বলেও জানান তিনি।
একটি কিশোরীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়দের শোকাহত করেছে। ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।