মুহাম্মদ আল আমিন (এম.এ) : প্রেম, ভক্তি আর অসীম ধৈর্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পশ্চিম বামনাইল (ঝিকরাপাড়া) গ্রামের কৃতি সন্তান মরহুম হামিদুজ্জামান। বাঁশের কড়ি কলম, সাধারণ কালি আর আর্ট পেপারকে সঙ্গী করে দীর্ঘ আট বছরের নিরবচ্ছিন্ন সাধনায় তিনি নিজ হাতে লিখে গেছেন সম্পূর্ণ পবিত্র কোরআন শরিফ। ১ হাজার ১০০ পৃষ্ঠার এই সুবিশাল গ্রন্থের বর্তমান ওজন প্রায় ৬১ কেজি, যা সংরক্ষণের সুবিধার্থে দুটি গরুর চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা হয়েছিল।
সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ১৯৮২ সালে হামিদুজ্জামান এই পবিত্র কাজের সূচনা করেন। লক্ষ্য ছিল একটাই আল্লাহর কালাম নিজ হাতে, নিজ যত্নে ধারণ করে রাখা। ঘরে একাকী বসে টানা সাত-আট ঘণ্টা পরম ভক্তি ও একাগ্রতার সঙ্গে তিনি একেকটি পৃষ্ঠা ফুটিয়ে তুলতেন, লেখার সময় ঘরে কাউকে প্রবেশ করতে দিতেন না যেন এই মুহূর্তটুকু হয়ে ওঠে একান্তই তাঁর আর তাঁর প্রভুর মধ্যেকার এক নিবিড় সংযোগ। লেখার সুবিধার্থে তাঁর দুই ছেলে আর্ট পেপারে সূক্ষ্ম দাগ টেনে দিতেন, আর তিনি গুডলাক ও ক্যামেল ব্র্যান্ডের কালিতে বাঁশের কলম ডুবিয়ে একবারে ১০ পৃষ্ঠা করে লিখে যেতেন ঐশী বাণী।
এভাবে আট বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে সম্পূর্ণ হয় ১ হাজার ১০০ পৃষ্ঠার এই বিশাল কোরআন শরিফ। ১৯৯০ সালে ঢাকার গোপীবাগ লেনের একটি দোকানে ৩২ হাজার টাকা ব্যয়ে তা বাঁধাই করা হয়। বাঁধাই শেষে গ্রন্থখানার দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ২৯ ইঞ্চি, প্রস্থ ২৩ ইঞ্চি ও উচ্চতা ৯ ইঞ্চি-সত্যিকার অর্থেই এক ব্যতিক্রমী ও বিরল কীর্তি।
এই মহামূল্যবান সৃষ্টিকে শুধু নিজের কাছে সীমাবদ্ধ না রেখে হামিদুজ্জামান স্বপ্ন দেখেছিলেন এর মাধ্যমে ইসলামের সেবা করার। ১৯৯২ সালে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই কোরআন শরিফ নিয়ে যান এবং একটি আবেদনপত্র জমা দেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে গ্রন্থখানার নির্ভুলতা যাচাই হবে, ঢাকায় মুসলিম বিশ্বের কূটনীতিকদের নিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনীর আয়োজন হবে, বিভিন্ন মুসলিম দেশের প্রধান শহরেও তা প্রদর্শিত হবে, আর শেষে রাষ্ট্রীয়ভাবে তা সৌদি আরব কিংবা ব্রুনেইয়ের বাদশাহকে উপহার হিসেবে পাঠানো হবে। এই উদ্যোগ থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখতেন কোরআন, হাদিস ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে একটি আধুনিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার।
তাঁর স্বপ্নের একটি অংশমাত্র বাস্তবায়িত হয়েছিল। গ্রন্থখানার নির্ভুলতা যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে। ২০০৭ সালে ফাউন্ডেশনের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি সামান্য কিছু সংশোধনের জন্য হামিদুজ্জামানকে আহ্বান জানায়, আর তিনি মাত্র তিন দিনেই তা সম্পন্ন করে গ্রন্থটির শতভাগ নির্ভুলতা নিশ্চিত করেন তাঁর নিষ্ঠা আর দক্ষতার আরেক প্রমাণ। কিন্তু এরপর তাঁর বাকি স্বপ্নগুলো প্রদর্শনী, উপহার প্রেরণ কিংবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। গ্রন্থখানাও তাঁকে ফেরত দেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে নিজের এই আজীবনের সাধনার ফল ফেরত চেয়ে আবেদন করলে ২০০৪ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্রন্থখানা এখন তাদেরই সম্পত্তি।
আজ হামিদুজ্জামান নেই ১৯৪৪ সালের ১১ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া এই মানুষটি পৃথিবী ছেড়ে গেছেন ২০০৭ সালের ১৬ জানুয়ারি। কিন্তু তাঁর সাধনার এই অনন্য নিদর্শন আজও রয়ে গেছে ঢাকার ইসলামিক ফাউন্ডেশন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে। তাঁর স্ত্রী রাশিয়া বেগম একবার সেই গ্রন্থখানা দেখতে গিয়ে হৃদয় ভেঙে পড়েছিলেন পলিথিনে মোড়ানো থাকলেও অযত্নে অনেক পৃষ্ঠা পরস্পর জোড়া লেগে গেছে, ফিকে হয়ে এসেছে পাতার উজ্জ্বলতা। পরিবারের আকুতি, যথাযথ ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা না হলে একদিন হয়তো নষ্টই হয়ে যাবে এই অমূল্য সম্পদ।
একটি ক্যালিগ্রাফি শিল্পকর্ম হিসেবে এটি যেমন বাংলাদেশের গর্ব, তেমনি ধর্মীয় দিক থেকেও এক ঐতিহাসিক দলিল। সচেতন মহলের প্রত্যাশা এই ঐতিহাসিক হাতে লেখা কোরআন শরিফটিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হোক, যাতে আগামী প্রজন্মও একজন সাধকের এই অভাবনীয় ধর্মীয় অনুরাগের পরিচয় পেতে পারে।
গ্রামের বাড়িতে আজও যত্নে রাখা আছে হামিদুজ্জামানের স্মৃতিচিহ্ন তাঁর ব্যবহৃত ১৬টি বাঁশের কলম, আলাদাভাবে লেখা কোরআনের কয়েকটি পাতা, আর বিভিন্ন মুসলিম দেশের রাষ্ট্রদূত ও দেশের প্রধানমন্ত্রীসহ নানা দপ্তরে পাঠানো চিঠিপত্রের অনুলিপি। তাঁর দুই ছেলে এ কে এইচ এম মোফাসসিরুজ্জামান ও নওরিনুজ্জামান আজ গ্রামে কৃষিকাজে জড়িত থাকলেও বাবার এই অসাধারণ কীর্তি নিয়ে আজও গর্বিত।
একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ নিষ্ঠা আর ভালোবাসার এই দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে, ঈমানের গভীরতা থেকে জন্ম নেওয়া কাজ কখনো সহজে হারিয়ে যায় না তা কালের সাক্ষী হয়ে থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্মে।