মুহাম্মদ আল আমিন (এমএ), সমস্ত প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর জন্য, যিনি অসীম কুদরত, গভীর হিকমত ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সুবিশাল সৃষ্টিজগৎ-আসমান, জমিন এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু-অস্তিত্ব দান করেছেন। পবিত্র কোরআনুল কারিমে বারবার এই সত্য উচ্চারিত হয়েছে যে, তিনি ছয় দিনে আসমান-জমিনের সৃষ্টিকর্ম সমাপ্ত করেছেন। এই ঘোষণায় একদিকে যেমন প্রকাশ পেয়েছে তাঁর অসীম শক্তির নিদর্শন, তেমনি বান্দার জন্য রয়েছে পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা ও ধৈর্যের এক মূল্যবান শিক্ষা।
কুরআনের সাক্ষ্য: ছয় দিনে সৃষ্টির ঘোষণা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত (ইস্তিওয়া) হয়েছেন। তিনিই রাত দ্বারা দিনকে আচ্ছাদিত করেন, যা দ্রুতগতিতে তার অনুসরণ করে। আর সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রসমূহ তাঁরই আদেশের অনুগত। জেনে রাখো, সৃষ্টি ও নির্দেশ কেবল তাঁরই। কতই না বরকতময় আল্লাহ, বিশ্বজগতের প্রতিপালক। (সূরা আল-আ'রাফ, ৭:৫৪)
শুধু এই একটি আয়াতেই নয়-পবিত্র কোরআনুল কারিমে আরও ছয়টি স্থানে এই সত্য পুনর্ব্যক্ত হয়েছে, যা এই বিষয়ের দৃঢ়তা ও নিশ্চয়তাকে সুসংহত করে:
সূরা ইউনুস (১০:৩)
সূরা হুদ (১১:৭)
সূরা আল-ফুরকান (২৫:৫৯)
সূরা আস-সাজদাহ (৩২:৪)
সূরা কাফ (৫০:৩৮)
সূরা আল-হাদীদ (৫৭:৪)
ছয় দিনের সৃষ্টির ধারাবাহিকতা
সৃষ্টির এই পর্যায়ক্রমিক বিবরণ সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে এসেছে সূরা হা-মীম আস-সাজদা তথা সূরা ফুসসিলাতের ৯-১২ নং আয়াতে। তাফসিরকারগণের আলোচনা থেকে জানা যায়-
প্রথম দুই দিনে পৃথিবীর মূল সৃষ্টি সম্পন্ন করা হয়।
পরবর্তী দুই দিনে পৃথিবীতে পাহাড় স্থাপন, তাতে বরকত দান এবং সকল সৃষ্টির জীবিকার ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়।
শেষ দুই দিনে সাত আসমান সৃষ্টি করা হয় এবং প্রতিটি আসমানের জন্য তার নির্ধারিত বিধান স্থির করা হয়।
এভাবে মোট ছয় দিনে আল্লাহ তাআলা আসমান ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পন্ন করেন।
আল্লাহ কি চাইলে মুহূর্তেই সব সৃষ্টি করতে পারতেন না? নিঃসন্দেহে পারতেন। তিনিই বলেন-তিনি যখন কোনো কিছু ইচ্ছা করেন, তখন শুধু বলেন, 'হও', আর তা হয়ে যায়। (সূরা ইয়াসীন, ৩৬:৮২)
ছয় দিনে সৃষ্টি করার হিকমত
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন, আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য শিক্ষা হিসেবে সৃষ্টিকে ধাপে ধাপে সম্পন্ন করেছেন।
তাবেয়ী সাঈদ ইবন জুবাইর (রহ.) বলেন, আল্লাহ চাইলে এক মুহূর্তেই সব সৃষ্টি করতে পারতেন; কিন্তু তিনি তাঁর বান্দাদের পরিকল্পনা, ধৈর্য ও ধারাবাহিকতার শিক্ষা দেওয়ার জন্যই ধাপে ধাপে সৃষ্টি সম্পন্ন করেছেন।
তাফসিরে মাজহারিতে অর্থগতভাবে একটি হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে যে, ধীরস্থিরতা ও বিবেচনার সঙ্গে কাজ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর তাড়াহুড়া শয়তানের প্ররোচনা।
এই শিক্ষা কেবল আধ্যাত্মিক জগতেই সীমাবদ্ধ নয়-আমাদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দ্বীনি কাজ-জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর প্রয়োগ সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
এই ছয় দিন কি আমাদের ২৪ ঘণ্টার দিনের মতো?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে-তখন তো সূর্য-চন্দ্রের বর্তমান ব্যবস্থাই ছিল না, তাহলে "দিন" কীভাবে গণনা করা হলো?
উলামায়ে কেরামের ব্যাখ্যা হলো, কুরআনে ব্যবহৃত "ইয়াওম" শব্দটি একটি নির্দিষ্ট সময়কাল বোঝায়, যা আমাদের বর্তমান ২৪ ঘণ্টার দিনের সমান হওয়া আবশ্যক নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-তোমার প্রতিপালকের কাছে একদিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান।" (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৪৭)
তিনি বলেন-ফেরেশতাগণ ও রূহ তাঁর দিকে আরোহণ করে এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।" (সূরা আল-মা'আরিজ, ৭০:৪)
এ থেকে স্পষ্ট হয়, আল্লাহর নির্ধারিত সময়ের পরিমাপ মানুষের প্রচলিত সময়ের পরিমাপের অনুরূপ নয়।
কোন দিনে কী সৃষ্টি হয়েছিল?
সূরা ফুসসিলাতের আয়াতসমূহ এবং তাফসিরে ইবনু কাসীর, তাফসিরে তাবারী ও মা'আরিফুল কুরআনের আলোচনায় উল্লেখ রয়েছে-
রবিবার ও সোমবার: পৃথিবীর সৃষ্টি।
মঙ্গলবার ও বুধবার: পাহাড়, নদী, বৃক্ষ, খনিজ এবং জীবিকার উপকরণ সৃষ্টি।
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার: সাত আসমান সৃষ্টি সম্পন্ন।কিছু বর্ণনায় শুক্রবারের শেষ প্রহরে হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টির কথাও উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, এই দিনভিত্তিক বিভাজন মূলত তাফসিরের আলোকে প্রাপ্ত ব্যাখ্যা। কুরআনের সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত বক্তব্য কেবল এতটুকুই যে, আসমান ও পৃথিবীর সমগ্র সৃষ্টি ছয় দিনে সম্পন্ন হয়েছে।
মুমিনের হৃদয়ের খোরাক ও বাস্তব জীবনের সবক
মহাবিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণা আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। ছয় দিনে সৃষ্টি করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদের চারটি গভীর জীবনমুখী সবক দিয়েছেন:
১. পরিকল্পিত জীবন: যেকোনো সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত পরিকল্পনা, যা আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিতে দেখিয়েছেন।
২. সবর ও ধারাবাহিকতা: তাড়াহুড়ো না করে ধৈর্য ও অবিচলতার সাথে লক্ষ্যপানে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
৩. ইহসান বা কাজের পূর্ণতা: আল্লাহ যেমন প্রতিটি সৃষ্টি সুষম ও নিখুঁতভাবে শেষ করেছেন, তেমনি মুমিনের উচিত তার ইবাদত ও কর্মকে ত্রুটিমুক্ত ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা।
৪. তাফাক্কুর বা স্রষ্টাকে চেনা: যেমন একটি সুউচ্চ ও সুদৃশ্য অট্টালিকা একজন দক্ষ স্থপতির পরিচয় বহন করে, তেমনি এই সুবিন্যস্ত ও সুশৃঙ্খল মহাবিশ্ব তার মহান স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব, একত্ব, পরম ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দেয়।
আসুন, আমরা কেবল জবান দিয়ে নয়, অন্তরের চোখ দিয়ে আল্লাহর এই সৃষ্টিজগতকে অবলোকন করি। মহাবিশ্বের এই সুশৃঙ্খল পরিক্রমা দেখে আমাদের অন্তর যেন তাঁর প্রেমে মগ্ন হয়, আমাদের ঈমান যেন আরও সুদৃঢ় হয় এবং আমাদের জীবন যেন তাঁরই গোলামীতে সমর্পিত হয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের পবিত্র কোরআনুল কারিমে নিদর্শনসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার, তাঁর মহিমা উপলব্ধি করার এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথে জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।
সাংবাদিক | লেখক | কলামিস্ট