বিশেষ প্রতিবেদক: কালের পরিক্রমায় সময়ের স্রোতে বদলে গেছে কত রূপ, কত জনপদ। তবে প্রাচীন বাংলার ঐতিহাসিক রাজধানী নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আজও পরম নীরবতায় কালের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে সুফি-সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র প্রাঙ্গণ পাঁচ পীরের মাজার । যা স্থানীয়ভাবে পাঁচ বিবির মাজার নামেও সর্বজনবিদিত। ইসলামী আধ্যাত্মিক চেতনা, অলী-আউলিয়াদের প্রতি ভক্তি ও সুলতানি-মুঘল স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব সুরম্য সংমিশ্রণ এই ঐতিহাসিক স্থানটি।
জানা যায়, উপজেলা মোগরাপাড়া ইউনিয়নে অবস্থিত এই পবিত্র প্রাঙ্গণ। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীনকালে সোনারগাঁও যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান, সমৃদ্ধ বাণিজ্য ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ছিল, তখন সুদূর প্রাচ্য ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে অসংখ্য সুফি-সাধক ও ধর্মপ্রচারক এই জনপদে আগমন করেন। তাঁদের ত্যাগ, সুন্দর চরিত্র এবং শান্তির বাণীর ওপর ভর করেই এ অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে ইসলামের সুশীতল ছায়া। লোকমুখে এটি ‘পাঁচ বিবির মাজার’ নামে প্রচলিত থাকলেও, মূলত ইসলামের পাঁচজন মহান আধ্যাত্মিক পুরুষ ও সাধকের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত এই দরগাহ্।
প্রাচীন বাংলার এই সমৃদ্ধ জনপদের বুকেই রয়েছে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি, প্রখ্যাত আলেম ও সাধক শাহ ইব্রাহিম দানিশমান্দ (রহ.)-এর দরগাহ্ এবং বার ভূঁইয়া প্রধান ঈসা খাঁর স্ত্রী সোনাবিবির মাজারসহ একাধিক ঐতিহাসিক নিদর্শন। উল্লেখ্য, এই সোনাবিবির নামানুসারেই প্রাচ্যের এই সমৃদ্ধ ভূখণ্ডের নামকরণ সোনারগাঁও হয়েছিল বলে প্রবল জনশ্রুতি রয়েছে। একসময়ের বিশ্বখ্যাত মসলিনের বাণিজ্যকেন্দ্র ও ঐতিহাসিক নদী বন্দর সোনারগাঁয়ের এই দরগাহ্ প্রাঙ্গণটি তাই একাধারে ধর্মীয় ও জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্ব বহন করে।
মাজারের প্রাচীন ইটের গাথুনি, অনন্য মেহরাব ও নকশায় সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্যরীতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোলাহলমুক্ত নিস্তব্ধ পরিবেশ ও গম্ভীর স্থাপত্যরীতি নিমেষেই দর্শনার্থীদের আত্মাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এক অলৌকিক প্রশান্তিতে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানকার সুফি সাধকদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে গভীর লোকবিশ্বাস ও সুদৃঢ় ধর্মীয় আবেগ। আজও দূর-দূরান্ত থেকে তৌহিদকামী ও ইতিহাসপ্রেমী মানুষ ছুটে আসেন এখানে দোয়া-দরুদ, জিয়ারত এবং আত্মিক প্রশান্তির খোঁজে।
রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে হওয়ায় পানাম নগর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন (সোনারগাঁ জাদুঘর) কিংবা বাংলার তাজমহলের পাশাপাশি ইতিহাস ও ধর্ম অনুরাগী পর্যটকদের কাছে এটি এক অন্যতম আকর্ষণ। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে ধর্মপ্রাণ মানুষ ও ভক্তবৃন্দের সমাগমে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো মাজার এলাকা।
ঐতিহাসিক স্থাপনাটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন স্থানীয় প্রবীণ ও গবেষকরা। যথাযথ উদ্যোগ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে প্রাচীন সোনারগাঁয়ের এই ইসলামী আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের কাছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাসের পাঠশালা হিসেবে টিকে থাকবে বহুকাল।