মুহাম্মদ আল আমিন (এমএ): পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষে হাজিদের হৃদয়ের সবটুকু আবেগ আর ভালোবাসা এখন আবর্তিত হচ্ছে মদিনাতুল মুনাওয়ারাকে কেন্দ্র করে। মক্কার মরুপ্রান্তরে হজের প্রধান ইবাদত-বন্দেগি সমাপনের পর, আল্লাহর মেহমানরা এখন দলে দলে ছুটে আসছেন শান্তির নগরী মদিনায়। সবার লক্ষ্য একটাই সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ মানব, নূরে মুজাসসাম হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারত, তাঁর সমীপে দরুদ ও সালাম পেশ এবং দুনিয়ার বুকে এক টুকরো জান্নাত ‘রিয়াজুল জান্নাতে’ সেজদা দেওয়া।
মসজিদে নববীর সবুজ গম্বুজের নিচে সোনালী জালের সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রু ধরে রাখতে পারছেন না কোনো হাজিই। আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ অত্যন্ত বিনম্র ও ভক্তিপূর্ণ কণ্ঠে হাজীদের এই সালামে মদিনার বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠছে।
প্রিয় নবীজির রওজা জিয়ারতের ব্যাপারে বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি আমার ওফাতের পর আমার রওজা জিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমার সাথে সাক্ষাৎ করল। (সুনানে দারা কুতনি: ২৬৬৯, মিশকাতুল মাসাবিহ)
অন্য হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি আমার রওজা জিয়ারত করবে, তার জন্য আমার শাফায়াত (সুপারিশ) ওয়াজিব হয়ে যাবে। (সুনানে দারা কুতনি: ২৬৯৫)
মসজিদে নববীর ভেতরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হুজরা (রওজা শরীফ) থেকে তাঁর মিম্বর পর্যন্ত ২২ মিটার দীর্ঘ ও ১৫ মিটার প্রস্থের বিশেষ জায়গাটুকুই হলো ‘রিয়াজুল জান্নাত’ বা বেহেশতের বাগান। এই অংশের কার্পেটের রঙ সাদা-সবুজ, যা মসজিদের অন্য অংশের লাল কার্পেট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই স্থানে ইবাদতের ফজিলত সম্পর্কে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমার ঘর (হুজরা) এবং মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটুকু জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান। (সহিহ বুখারি: ১১৯৬, সহিহ মুসলিম: ১৩৯১)
এখানে আদায় করা প্রতিটি ইবাদত সরাসরি আল্লাহর দরবারে কবুল হয় বলে হাজিরা এখানে দু'রাকাত নফল নামাজ ও রোনাজারির জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন।
রিয়াজুল জান্নাতের ভেতরে সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি কয়েকটি স্তম্ভ বা খুঁটি রয়েছে, যেগুলো স্বর্ণালী ক্যালিগ্রাফি দিয়ে চিহ্নিত। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এগুলো ছিল খেজুর গাছের কাণ্ড। এই খুঁটিগুলোর পেছনে রয়েছে ইসলামের ইতিহাসের অত্যন্ত আবেগঘন ও অলৌকিক সব ঘটনা:
১. উস্তুওয়ানায়ে হান্নানা (কান্নার খুঁটি)
এটি মেহরাবের ডান পাশে অবস্থিত সবচেয়ে বিখ্যাত খুঁটি। মিম্বর তৈরির আগে নবীজি (সা.) এই খেজুর গাছের খুঁটিতে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন। যখন কাঠ দিয়ে নতুন মিম্বর তৈরি করা হলো এবং নবীজি খুঁটিটি ছেড়ে মিম্বারে উঠলেন, তখন উপস্থিত শত শত সাহাবীর সামনে এই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে।
হাদিসের রেফারেন্স: হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, "মিম্বর স্থাপন করার পর আমরা খুঁটি হতে ক্রন্দন করার শব্দ শুনতে পেলাম। এরপর নবীজি (সা.) মিম্বর হতে নেমে এসে খুঁটির ওপর হাত রাখলেন (জড়িয়ে ধরলেন) এবং উস্তুওয়ানাটি শান্ত হলো।" (সহিহ বুখারি: ৩২৮, জুমআ অধ্যায়)
②. উস্তুওয়ানায়ে আয়েশা বা কুরআহ (লটারি খুঁটি)
রিয়াজুল জান্নাতের ঠিক মাঝখানে এটি অবস্থিত। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এই মসজিদে এমন একটি জায়গা আছে, মানুষ যদি সেখানে নামাজ পড়ার ফজিলত জানত, তবে সেখানে জায়গা পাওয়ার জন্য লটারি করত। সাহাবিরা জায়গাটি জানতে চাইলে তিনি তা গোপন রাখেন। পরবর্তীতে হযরত আয়েশা (রা.) তাঁর ভাগ্নে আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-কে গোপনে জায়গাটি চিনিয়ে দেন। সেটিই আজকের এই স্তম্ভ।
৩. উস্তুওয়ানায়ে তাওবা বা আবু লুবাবাহ (ক্ষমা প্রার্থনার খুঁটি)
বনু কুরাইজা যুদ্ধের সময় সাহাবি হযরত আবু লুবাবাহ (রা.) অবধানতাবশত একটি ভুল করে বসেন। অনুশোচনা থেকে তিনি নিজেই নিজেকে এই খুঁটির সাথে বেঁধে কসম করেন, যতক্ষণ না আল্লাহ আমার তাওবা কবুল করবেন এবং নবীজি নিজ হাতে আমাকে মুক্ত করবেন, ততক্ষণ আমি এই বাঁধনে থাকব। দীর্ঘ দিন অনাহার ও কান্নার পর অবশেষে তাহাজ্জুদের সময় ওহীর মাধ্যমে তাঁর তাওবা কবুল হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে তাঁর বাঁধন খুলে দেন। (সুনানে বায়হাকি)
৪. উস্তুওয়ানায়ে সারীর (বিশ্রামের খুঁটি)
'সারীর' শব্দের অর্থ খাট বা শোবার স্থান। রমজান মাসের শেষ দশ দিন যখন আল্লাহর রাসূল (সা.) মসজিদে ইতিকাফ করতেন, তখন তাঁর আরামের জন্য খেজুরের পাতার তৈরি একটি চাটাই বা খাট এই খুঁটির পাশে রাখা হতো।
৫. উস্তুওয়ানায়ে আলী বা হারস (পাহারা দেওয়ার খুঁটি)
'হারস' মানে পাহারা দেওয়া। ইসলামের প্রথম দিকে যখন নবীজি (সা.)-এর নিরাপত্তার প্রয়োজন ছিল, তখন হযরত আলী (রা.)-সহ প্রধান সাহাবিরা এই খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে নবীজিকে পাহারা দিতেন। পরবর্তীতে সূরা মায়িদার ৬৭ নম্বর আয়াত-আল্লাহ আপনাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন নাজিল হওয়ার পর নবীজি (সা.) এখান থেকে পাহারা তুলে নেন।
৬. উস্তুওয়ানায়ে উফুদ (প্রতিনিধি দলের খুঁটি)
'উফুদ' অর্থ প্রতিনিধি দল। মদিনায় ইসলামের জয়জয়কারের পর আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যে সমস্ত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিনিধি দল নবীজি (সা.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন, নবীজি এই খুঁটির পাশে বসে তাদের সাথে বৈঠক করতেন এবং ইসলাম শিক্ষা দিতেন।
হাজীদের বিদায়ী অশ্রু
মদিনার এই নূরানী ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ হাজীদের হজের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে এক স্বর্গীয় শান্তি জোগাচ্ছে। একদিকে জীবনের শ্রেষ্ঠতম ইচ্ছা পূরণের পরম তৃপ্তি, অন্যদিকে প্রিয় নবীজির শহর থেকে বিদায় নেওয়ার বুকফাটা বেদনা-এই দুইয়ের দোলাচলে মদিনার মাটি এখন হাজীদের অশ্রুতে সিক্ত। পরম করুণাময়ের দরবারে হাজীদের ব্যাকুল আকুতি, হে আল্লাহ! এই জিয়ারত যেন জীবনের শেষ জিয়ারত না হয়।