মুহাম্মদ আল আমিন,(এমএ): আজ ১০ মহররম, শুক্রবার। মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শোকাবহ দিন আজ।, সারা দেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর এক অন্তহীন তাৎপর্য ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের স্মারক। আরবি আশারা শব্দের অর্থ দশ, আর আশুরা মানে দশম। সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে শুরু করে ইসলামের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ঘটে যাওয়া বহু যুগান্তকারী ঘটনার অনন্য সাক্ষী মহররম মাসের এই দশম দিনটি। একই সাথে ইসলামী ইতিহাসে দিনটি একই সঙ্গে আনন্দ, কৃতজ্ঞতা, ত্যাগ ও গভীর শোকের এক মিশ্র স্মৃতি বহন করে।
মহান আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা পাওয়ার আশায় বিশ্বজুড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আজ নফল রোজা, নামাজ, দান-খয়রাত ও জিকির-আসকারের মধ্য দিয়ে দিনটি অতিবাহিত করছেন। হাদিস অনুযায়ী, এই পবিত্র দিনেই আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারী বনী ইসরাইলকে অত্যাচারী ফেরাউনের নিদারুণ জুলুম থেকে অলৌকিক মুক্তি দিয়েছিলেন এবং নীল নদে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন ফেরাউনকে। এই মহান অনুগ্রহের শুকরিয়াস্বরূপ হযরত মুসা (আ.) নিজে রোজা রাখতেন। মদিনায় হিজরতের পর আল্লাহর রাসুল (সা.) ইহুদিদের এই দিনে রোজা রাখতে দেখে বলেছিলেন, মুসা (আ.)-এর সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমি তোমাদের চেয়ে অধিক নিকটবর্তী। এরপর তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং উম্মতকেও তা পালনের নির্দেশ দেন, তবে ইহুদিদের সংস্কৃতির সাথে যেন হুবহু মিলে না যায়, সেজন্য ১০ মহররমের আগের বা পরের দিনসহ আরও একটি রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মম ও বেদনাদায়ক ঘটনাক্রমে, বহু বছর পর হিজরি ৬১ সনের এই একই দিনে (১০ মহররম) ইরাকের কারবালা প্রান্তরে ঘটে যায় মানবেতিহাসের এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়। শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামের মহান আদর্শ ও খেলাফতি শাসনব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখতে, স্বৈরাচারী ও অন্যায়ের প্রতীক ইয়াজিদ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ফোরাত নদীর তীরে সপরিবারে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন মহানবী (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.)। কারবালার এই শোকাবহ ঘটনা যুগ যুগে মানুষকে অন্যায়, জুলুম ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায় এবং সত্য ও সুন্দরের পথে অবিচল থাকার প্রেরণা দেয়।
নিম্নে ইতিহাসের প্রখ্যাত ১০ জন ওলী ও আকাবিরের দৃষ্টিতে ১০ই মহররমের তাৎপর্য ও তাঁদের মূল্যবান বাণীসমূহ পরিমার্জিত রূপে তুলে ধরা হলো:
১. হযরত শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)
দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষা: আধ্যাত্মিক সম্রাট বড়পীর হযরত শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘গুনিয়াতুত তালিবীন’-এ ১০ই মহররমের রাত ও দিনকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহিমান্বিত মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মূল বাণী: এই মোবারক রাতের একাংশ ইবাদত-বন্দেগিতে জাগ্রত রাখা এবং দিনে রোজা রাখা আল্লাহর বিশেষ অনুকম্পা পাওয়ার পথ। তিনি একে আত্মশুদ্ধি এবং বিগত জীবনের গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়ার একটি অনন্য সুযোগ হিসেবে দেখতেন।
২. ইমাম আবু হামিদ আল-গাজালী (রহ.)
দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষা: ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ ইমাম গাজালী (রহ.) তাঁর অমর কিতাব ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’-এ ১০ই মহররমের সামাজিক ও পারিবারিক দিকটির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
মূল বাণী: এই দিনে পরিবার-পরিজনের জন্য সাধ্যমতো উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করা (তাওসি’) এবং আল্লাহর সৃষ্টি তথা অভাবী মানুষের মাঝে দান-সদকা করা অন্তরের সংকীর্ণতা দূর করে। তিনি একে সুন্নাহ সমর্থিত একটি বরকতময় আমল হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা মানুষের মাঝে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে।
৩. হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)
দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষা: উপমহাদেশের প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও মুহাদ্দিস শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) তাঁর ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ গ্রন্থে ১০ই মহররমের রোজার ভেতরের হিকমত ও বুদ্ধিবৃত্তিক কারণ উন্মোচন করেছেন।
মূল বাণী: ১০ই মহররমের রোজা মূলত আল্লাহর এক মহান অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ (মুসা আলাইহিস সালামের মুক্তি)। এই কৃতজ্ঞতাবোধ যখন বান্দা রোজার মাধ্যমে প্রকাশ করে, তখন আল্লাহর রহমতের জোশ শুল্ক হয়ে যায় এবং বান্দার পূর্ববর্তী এক বছরের সগীরা (ছোট) গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
৪. ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)
দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষা: বুখারী শরীফের বিশ্ববিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারী’-এর লেখক ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) ১০ই মহররমকে সুন্নাহর অনুসরণের এক কড়া পরীক্ষা হিসেবে দেখতেন।
মূল বাণী: রাসুলুল্লাহ (সা.) ১০ই মহররমে রোজা রেখেছেন এবং ইহুদিদের সংস্কৃতির সাথে যেন হুবহু মিলে না যায়, সেজন্য ৯ বা ১১ তারিখ মিলিয়ে রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। অতএব, ওলীর দৃষ্টিতে ১০ই মহররমের প্রকৃত সম্মান হলো—কোনো মনগড়া প্রথা নয়, বরং হুবহু সুন্নাহর তালীম অনুসরণ করা।
৫. শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)
দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষা: দারুল উলুম দেওবন্দের প্রখ্যাত শায়খুল হাদিস হযরত মাদানী (রহ.) তাঁর ‘مাকাতীব’ বা চিঠিপত্রে ১০ই মহররমের কারবালা ট্র্যাজেডিকে ইমানী অবিচলতার মানদণ্ড হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
মূল বাণী: কারবালার প্রান্তরে হযরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর আত্মত্যাগ কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই ছিল না, তা ছিল দ্বীনের সুমহান আদর্শ ও খেলাফতি শাসনব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখার আপসহীন সংগ্রাম। ১০ই মহররম আমাদের শিক্ষা দেয়, বাতিলের সামনে কখনো মাথা নত না করা।
৬. হযরত মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলভী (রহ.)
দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষা: বিখ্যাত হাদিস বিশারদ হযরত মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলভী (রহ.) তাঁর ‘ফাযায়েলে আমল’ গ্রন্থে এই দিনের ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
মূল বাণী: রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে ১০ই মহররমের রোজাই উম্মতের ওপর আবশ্যক ছিল। পরবর্তীতে তা নফল হলেও এর মর্যাদা কমেনি। বছরের শুরুতেই এই দীর্ঘকালীন ঐতিহ্যের আমলটি বুকে ধারণ করে উম্মতের অলসতা দূর করা উচিত।
৭. মুফতি মুহাম্মদ শফী উসমানী (রহ.)
দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষা: ‘মাআরিফুল কুরআন’ এর রচয়িতা মুফতি শফী উসমানী (রহ.) ১০ই মহররমকে পবিত্রতা রক্ষা এবং আত্মসংযমের মাস হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।
মূল বাণী: কুরআনুল কারীমে যে চারটি মাসকে ‘হুরমত’ বা বিশেষ সম্মানিত বলা হয়েছে, মহররম তার অন্যতম। ১০ই মহররমে কোনো প্রকার অন্যায়, গুনাহ কিংবা সমাজ-বিভেদ সৃষ্টি করা এই মাসের পবিত্রতা লঙ্ঘনের শামিল। এই দিনটি মূলত নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করার দিন।
৮. ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)
দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষা: প্রখ্যাত গবেষক ও ওলী ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর ‘যাদুল মাআদ’ গ্রন্থে ১০ই মহররমের আমলের বিন্যাসকে সূক্ষ্ম স্তরে ভাগ করেছেন।
মূল বাণী: ১০ই মহররমের ফজিলত পূর্ণমাত্রায় পেতে হলে এর সাথে ৯ তারিখের রোজাকে যুক্ত করা উত্তম। তিনি আমলের ক্ষেত্রে রিয়া (লোকদেখানো ভাব) পরিহার করে খাঁটি নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা ও জিকিরে মগ্ন থাকাকেই এই দিনের আসল রূপ বলেছেন।
৯. ইমাম শরফউদ্দিন ইয়াহইয়া নববী (রহ.)
দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষা: সহীহ মুসলিমের মহান ব্যাখ্যাকার ইমাম নববী (রহ.) হাদিসের আলোকে ১০ই মহররমকে আল্লাহর অফুরন্ত ক্ষমার এক অফার বা ঘোষণা হিসেবে দেখতেন।
মূল বাণী: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী, ১০ই মহররমের রোজা বান্দার পেছনের এক বছরের গুনাহ মুছে দেয়। একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দের দিন আর কী হতে পারে, যেখানে সামান্য একটু ইবাদতের বিনিময়ে মহান রব বান্দাকে ক্ষমা করে দিতে উন্মুখ থাকেন।
১০. হযরত আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.)
দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষা: ক্ষণজন্মা শায়খুল হাদিস আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) তাঁর ‘ফয়জুল বারী’ গ্রন্থে ১০ই মহররমের সুন্নাত ও আকিদাগত বিশুদ্ধতার ওপর আলোকপাত করেছেন।
মূল বাণী: ১০ই মহররমে পরিবারকে ভালো খাওয়ানোর হাদিসটি সনদের দিক থেকে গ্রহণযোগ্য এবং ওলীদের আমল দ্বারা প্রমাণিত। তবে একে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের মনগড়া উৎসব, খিচুড়ির বাধ্যবাধকতা কিংবা শোকের মাতম করা যাবে না। সুন্নাতকে সুন্নাতের গণ্ডিতে রাখাই ওলীদের তরীকা।