মুহাম্মদ আল আমিন (এমএ) : ফজরের আজান ভেসে আসে নীরব শহরের বুক চিরে। ঘুম ভেঙে কেউ অজু সেরে ছুটে যান মসজিদের পানে, কেউবা অ্যালার্ম বন্ধ করে গা এলিয়ে দেন আরেকটু ঘুমের আশায়। প্রতিটি প্রাতঃকালই যেন মানুষের সামনে উন্মোচন করে দুটি ভিন্ন পথ-আল্লাহর স্মরণে দিন শুরু করা, নাকি পার্থিব ব্যস্ততার স্রোতে নিজেকে হারিয়ে ফেলা।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের ঐতিহাসিক মিম্বর থেকে ধ্বনিত হলো এই প্রশ্নটিরই এক গভীর ও আত্মোপলব্ধিমূলক জবাব। আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা আলেম, ভারতের ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস আল্লামা মুফতি আবুল কাসেম নোমানীর প্রাজ্ঞ কণ্ঠে সেদিন উচ্চারিত হয় এমন এক শাশ্বত বার্তা-যা কেবল মসজিদের চার দেয়াল বা প্রথাগত ইবাদতের চৌহদ্দিতে আটকে থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে।
জুমার সময় যত ঘনিয়ে আসছিল, জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে বাড়ছিল ধর্মপ্রাণ মানুষের বাঁধভাঙা উপস্থিতি। মূল ভবন পেরিয়ে বারান্দা, সিঁড়ি ও বাইরের চত্বরে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে কাতার। উপমহাদেশীয় ইসলামি শিক্ষা ও দ্বীনি ঐতিহ্যের এক জীবন্ত ধারকের উপস্থিতি এই জুমাকে রূপ দেয় এক অভূতপূর্ব মাহেন্দ্রক্ষণে।
বয়ানের কেন্দ্রে ছিল হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-বর্ণিত একটি হাদিস। একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেছিলেন-কে আছেন যিনি তাঁর কাছ থেকে কিছু বিষয় গ্রহণ করে তার ওপর আমল করবেন। সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিয়েছিলেন হজরত আবু হুরায়রা (রা.)। এরপর নবিজি তাঁর হাত ধরে একে একে বলেছিলেন পাঁচটি উপদেশ, যা মুফতি নোমানী বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন মুসল্লিদের সামনে।
১. হারাম থেকে বেঁচে থাকা - নেক আমল করা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু হারাম বর্জন করা কঠিন সাধনার বিষয়। যিনি সর্বপ্রকার হারাম থেকে দূরে থাকতে পারেন, তিনিই সবচেয়ে বড় ইবাদতগুজার।
২. কানাআত বা তুষ্টি - আল্লাহপ্রদত্ত রিজিকে সন্তুষ্ট থাকাই প্রকৃত ধনাঢ্যতা। বাহ্যিক সম্পদ নয়, অন্তরের প্রশান্তিই আসল প্রাচুর্য।
৩. প্রতিবেশীর হক আদায় - যার অসদাচরণ থেকে প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না, নবিজি তিনবার বলেছিলেন সে প্রকৃত মুমিন হতে পারে না।
৪. অন্যের জন্য কল্যাণ কামনা - নিজের জন্য যা পছন্দ করি, অন্যের জন্যও তা কামনা করাই পূর্ণাঙ্গ মুসলমানের পরিচয়।
৫. অতিরিক্ত হাসি পরিহার -হাসিকে তিন প্রকারে ভাগ করে তিনি ব্যাখ্যা করেন-মুচকি হাসি, স্বাভাবিক হাসি ও অট্টহাসি। নবিজির জীবনে অট্টহাসির প্রমাণ মেলে না; অতিরিক্ত হাস্যরস অন্তরের গাম্ভীর্য ম্লান করে দেয়।
বয়ানের শেষে তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ যেন সবাইকে এই পাঁচ উপদেশ মেনে চলার তৌফিক দেন। পরে জাতীয় মসজিদের খতিব ফকিহ আবদুল মালিক হাফিজাহুল্লাহ পুরো বয়ানের বাংলা সারাংশ তুলে ধরেন, যাতে ভাষাগত দূরত্ব কারও বোঝায় বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।