নুসরাত জাহান সুমাইয়া, সোনারগাঁও থেকে: সারি সারি তাকে সাজানো বই, নীরব পাঠককক্ষ আর অপেক্ষায় থাকা চেয়ার-নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের জ্যোতি বসু মেমোরিয়াল গ্রন্থাগারের বর্তমান চিত্র যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের গল্প। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই জ্ঞানভাণ্ডারে বইয়ের অভাব নেই, অভাব শুধু পাঠকের পদচারণার। স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত কার্যক্রম ও আধুনিক সুবিধার অভাবে সম্ভাবনাময় এই গ্রন্থাগার হারাচ্ছে তার প্রাণচাঞ্চল্য।
উপজেলার বারদীর ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া এলাকায় ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা সরকারি খরচে নির্মিত জ্যোতি বসু মেমোরিয়াল গ্রন্থাগার ও সংগ্রহশালাটি আজ কোটি টাকার এক প্রাণহীন ভবনে রূপ নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর স্মৃতি ধরে রাখতে বিশাল অবকাঠামো ও বইয়ের ভান্ডার নিয়ে এটি দাঁড়িয়ে থাকলেও, ভেতরের পরিবেশের সঙ্গে পাঠকের উপস্থিতির কোনো মিল নেই। পর্যাপ্ত আধুনিক সুবিধার অভাব ও প্রশাসনের উদাসীনতায় সুবিশাল এই পাঠাগারটি এখন তীব্র পাঠকশূন্যতার খরায় ধুঁকছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, লাইব্রেরির প্রতিটি কক্ষ বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, পড়ার টেবিল-চেয়ারগুলোও সাজানো-গোছানো রয়েছে। তাকে তাকে শোভা পাচ্ছে আড়াই হাজারের বেশি ইতিহাস, রাজনীতি, সাহিত্য ও গবেষণাধর্মী দেশি-বিদেশি বই। তবে এত আয়োজন সত্ত্বেও পাঠককক্ষ সম্পূর্ণ ফাঁকা। সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেও বই হাতে কোনো পাঠকের দেখা মেলে না। দীর্ঘ সময় অলস বসে থেকে দিন পার করছেন দায়িত্বে থাকা কর্মচারী ও সহকারী লাইব্রেরিয়ান। মাঝেমধ্যে দু-একজন দর্শনার্থী চত্বরে ঘুরতে এলেও ছবি তোলা বা সেলফি নেওয়ার মধ্যেই তাঁদের কাজ সীমাবদ্ধ থাকছে; বইয়ের পাতা উল্টে দেখার আগ্রহ দেখা যায় না কারও মধ্যেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আবু ইউসুব পাঠক বলেন, এখনকার তরুণরা শুধু বইয়ের তাক দেখতে লাইব্রেরিতে আসে না; তারা একটি আধুনিক পাঠপরিবেশ চায়। নতুন প্রকাশনা, গবেষণাধর্মী বই, ডিজিটাল ক্যাটালগ ও ইন্টারনেট সুবিধা থাকলে পাঠকের আগ্রহ বাড়বে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে লাইব্রেরির সেবার ধরনও বদলানো দরকার। ভবন নয়, প্রয়োজন পাঠকের সাথে সর্ম্পক।
সোনারগাঁও উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মুহাম্মদ আল আমিন (এমএ) বলেন, একটি পাঠাগার টিকিয়ে রাখতে শুধু কোটি টাকা ব্যয় করে দালান কোঠা নির্মাণ যথেষ্ট নয়। পাঠকদের সাথে এর সংযোগ তৈরি করতে হয়। নিয়মিত পাঠচক্র, সাহিত্য আলোচনা, বই পর্যালোচনা ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা গেলে তরুণদের পাঠাগারমুখী করা সম্ভব।
স্থানীয় এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ আ: মালেক মাস্টার বলেন, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী এলাকায় পাঠাগারগুলো হওয়া উচিত সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার প্রাণকেন্দ্র। শিশু-কিশোরদের ছোটবেলা থেকেই বইয়ের সাথে যুক্ত করতে পরিবার, শিক্ষক ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
সোনারগাঁও উপজেলা সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির নেতা এম জাহাঙ্গীর হোসেন ভূইয়া বলেন,পাঠক সংকট দূর করার বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরিমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন বই সংযোজন ও নিয়মিত কার্যক্রম বাড়াতে কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন তারা।
সচেতন মহলের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজনের ব্যবস্থা করা গেলে এই নীরব ভবনটি আবারও পাঠকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠতে পারে।