মুহাম্মদ আল আমিন (এমএ): আরাফাতের ময়দান কেবল হজের একটি আনুষ্ঠানিক প্রান্তর নয়, এটি মানব ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত অসংখ্য নবী-রাসুলের কদমে ধন্য এক শাশ্বত পুণ্যভূমি। এই ভূমিতে মিশে আছে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের তাওবা, অশ্রুসিক্ত অনুশোচনা, রোনাজারি এবং ঐশী প্রেমের অমলিন স্মৃতি। যেন প্রতিটি ধূলিকণাই বহন করছে নবীদের হৃদয়ের আকুতি।
জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতরণের পর হযরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.) দীর্ঘ সময় একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তাঁরা নিজেদের ভুলের জন্য অশ্রুসজল নয়নে মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। অবশেষে এই পবিত্র আরাফাতের ময়দানেই তাঁদের পুনর্মিলন ঘটে, তাঁরা একে অপরকে চিনতে পারেন। পবিত্র কুরআনে বলেন, قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ: তাঁরা উভয়ে বলল, হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব। (সূরা আল-আ‘রাফ: ২৩) আরবি “আরাফা” (عَرَفَ) শব্দের অর্থ- জানা, চেনা বা পরিচিত হওয়া। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর এই ময়দানেই আদি পিতা-মাতার পুনঃপরিচয় ও মিলন ঘটেছিল বলেই এর নামকরণ হয়েছে আরাফাত।
তাফসিরে ইবনে কাসিরে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) যখন হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে হজের নিয়মাবলি শিক্ষা দিচ্ছিলেন, তখন তিনি এই স্থানে এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি কি সব চিনতে ও বুঝতে পেরেছেন? আ-আরাফতা? হযরত ইব্রাহিম (আ.) উত্তরে বলেছিলেন, হ্যাঁ, আমি চিনেছি।আরাফতু। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এই সংলাপ থেকেও আরাফাত নামটির উৎপত্তি হয়েছে। তবে আরাফাতের প্রকৃত মাহাত্ম্য নিহিত রয়েছে ৯ জিলহজের উকুফে আরাফা অর্থাৎ আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে বান্দার আকুল তাওবা, দোয়া ও আত্মসমর্পণে।
হজের বর্তমান কাঠামোর মূল রূপকার হলেন মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.)। এই আরাফাতের প্রান্তরেই তিনি মানবজাতির হেদায়েত, কল্যাণ ও নিরাপত্তার জন্য অশ্রুভেজা চোখে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন- فَإِذَا أَفَضْتُم مِّنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللَّهَ عِندَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ وَاذْكُرُوهُ كَمَا هَدَاكُمْ...
অর্থ: অতঃপর যখন তোমরা আরাফাত থেকে প্রত্যাবর্তন করবে, তখন মাশআরে হারামের নিকট আল্লাহকে স্মরণ করো এবং তাঁকে স্মরণ করো, যেভাবে তিনি তোমাদের পথপ্রদর্শন করেছেন, (সূরা আল-বাকারা: ১৯৮)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন, যুগে যুগে আগত প্রায় সব নবী-রাসুলই মক্কায় এসেছেন এবং হজ পালন করেছেন। হযরত মুসা (আ.), হযরত ঈসা (আ.), হযরত ইউনুস (আ.)-সহ বহু নবী ইহরাম বেঁধে “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক” ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে এই প্রান্তর অতিক্রম করেছেন। তাঁদের কান্না, তাসবিহ ও মিনতিতে বারবার ধন্য হয়েছে আরাফাতের মাটি।
পবিত্র কুরআনে নবীদের সেই বিনয় ও অশ্রুসিক্ত ইবাদতের চিত্র এভাবে ফুটে উঠেছে- إِذَا تُتْلَىٰ عَلَيْهِمْ آيَاتُ الرَّحْمَٰنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا অর্থ: যখন তাঁদের কাছে পরম করুণাময়ের আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হতো, তখন তাঁরা সেজদায় লুটিয়ে পড়তেন এবং ক্রন্দন করতেন। (সূরা মারইয়াম: ৫৮)
ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও আবেগঘন মুহূর্তটি এসেছিল ১০ হিজরিতে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনের একমাত্র হজ বিদায় হজ পালনকালে ৯ জিলহজ জাবালে রহমতের পাদদেশে দাঁড়িয়ে প্রায় এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার সাহাবির সমাবেশে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন।
সেদিন তিনি উম্মতের ক্ষমার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে এমন আবেগভরা দোয়া করেছিলেন যে, তাঁর চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল। আর সেই মহিমান্বিত মুহূর্তেই নাযিল হয় দ্বীন ইসলামের পূর্ণতার ঘোষণা- الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
অর্থ:-আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য জীবনব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম। (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩)
আরাফাতের ময়দান কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি তাওবা, প্রেম, অশ্রু এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের এক মহাসমুদ্র। এই প্রান্তর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় হাশরের ময়দানের কথা যেখানে সমগ্র মানবজাতি সাদা কাফনসদৃশ পোশাকে মহান রবের দরবারে সমবেত হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- الحَجُّ عَرَفَةُ অর্থ: হজ হলো আরাফাত। (সুনানে নাসাঈ, হাদিস: ৩০৪৪)
আদি পিতা হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সকল নবী-রাসুলের অশ্রু, তাওবা ও আধ্যাত্মিক চেতনার স্মৃতি বহন করছে আরাফাতের প্রতিটি ধূলিকণা। আজও প্রতি বছর বিশ্বের লাখো মুসলিম সেখানে সমবেত হয়ে আম্বিয়ায়ে কেরামের সেই অশ্রুভেজা তাওবার সুন্নতকে পুনর্জীবিত করেন এবং মহান আল্লাহর রহমতের সাগরে নিজেদের সিক্ত করেন।