মুহাম্মদ আল আমিন,(এমএ) : ইসলামে তাওবা বা আল্লাহর দিকে ফিরে আসার গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষ হিসেবে নানা ভুল ও গুনাহ হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়, তবে ভুলের আবর্তে নিমজ্জিত না হয়ে স্রষ্টার দরবারে অনুতপ্ত হৃদয়ে ফিরে আসাই মুমিনের প্রকৃত ভূষণ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর দরবারে খাঁটি তাওবা (তাওবাতুন নাসুহ) করো।(সূরা আত-তাহরিম, আয়াত: ৮)।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাওবার মূল ভিত্তি স্পষ্ট করে ইরশাদ করেছেন, অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা। (সুনানে ইবনে মাজাহ)। ইসলামের ইতিহাসে ১০ জন যুগশ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকিহ ও আধ্যাত্মিক সাধক পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে গুনাহের অনুশোচনা ও লজ্জিত হওয়ার গুরুত্ব সুনির্দিষ্টভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
১. হযরত শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)
বিশ্বখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) তাঁর কালজয়ী কিতাব গুনিয়াতুত তালিবীন ও ফুতুহুল গাইব-এ লিখেছেন, গুনাহের পর অন্তরে কোনো সংকোচ বা লজ্জা তৈরি না হওয়া হলো অন্তরের মৃত্যুর লক্ষণ। খাঁটি তাওবার প্রথম কদমই হলো কৃত পাপের জন্য আল্লাহর সামনে চরমভাবে লজ্জিত হওয়া।
২. ইমাম গাজালী (রহ.)
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজালী (রহ.) তাঁর অমর গ্রন্থ ইহয়াউ উলুমিদ্দীন-এ তাওবাকে জ্ঞান, অবস্থা ও কাজের সমষ্টি হিসেবে দেখিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, গুনাহের ক্ষতিকর দিক অনুধাবন থেকে হৃদয়ে যে তীব্র অনুশোচনা ও বেদনাদায়ক লজ্জাবোধ তৈরি হয়, সেটাই হলো তাওবার আসল প্রাণ।
৩. হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)
উপকালের যুগস্রষ্টা চিন্তাবিদ শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ' গ্রন্থে লিখেছেন, গুনাহ মানুষের পাশবিক শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। এই কলুষতা দূর করার একমাত্র উপায় তীব্র অনুশোচনা ও লজ্জা। লজ্জিত হওয়া ছাড়া মানুষের রূহানি মেলবন্ধন আল্লাহর সাথে পুনরায় জোড়া লাগে না।
৪. ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)
সর্বশ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বুখারি শরীফের বিশ্বখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারী-তে লিখেছেন, তাওবা কবুল হওয়ার জন্য প্রধান শর্ত হলো কৃত গুনাহের জন্য সম্পূর্ণ অনুতপ্ত হওয়া। যদি কেউ মুখে ক্ষমা চায় কিন্তু অন্তরে লজ্জিত না হয়, তবে সে মূলত মিথ্যুক তাওবাকারী।
৫. শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)
দারুল উলুম দেওবন্দের সাবেক সদরুল মুদাররিস হযরত মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) তাঁর 'মাকতুবাতে শায়খুল ইসলাম'-এ লিখেছেন, আল্লাহর আজাবের ভয় এবং নিজের অকৃতজ্ঞতার ওপর লজ্জিত হওয়া হলো ঈমানের প্রথম পরিচয়। তাওবার মূল কাজই হলো নির্জনে নিজের কৃতকর্ম স্মরণ করে আল্লাহর সামনে কান্নাকাটি করা।
৬. হযরত মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলভী (রহ.)
উপমহাদেশের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব 'ফাযায়েলে আমল' ও বুখারি শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'লালামিউদ দারাযী'-তে লিখেছেন, গুনাহ করার পর অলসতা বা অহংকার করা শয়তানের খাসলত, আর লজ্জিত হওয়া হযরত আদম (আ.)-এর খাসলত।
৭. মুফতি শফী উসমানী (রহ.)
বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ 'তাফসীরে মা'আরেফুল কুরআন'-এর রচয়িতা হযরত মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) সূরা আত-তাহরিমের ৮ নম্বর আয়াতের অধীনে লিখেছেন, খাঁটি তাওবার প্রথম রুকন বা স্তম্ভ হলো অন্তরে চরম লজ্জিত হওয়া। লজ্জিত হওয়া ছাড়া কেবল মৌখিক ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা এক ধরনের উপহাস মাত্র।
৮. ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)
আত্নশুদ্ধি বিষয়ক কালজয়ী গ্রন্থ 'মাদারিজুস সালিকীন'-এর লেখক ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) লিখেছেন, গুনাহের কারণে অন্তরে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা কেবল লজ্জিত হওয়া ও তাওবার মাধ্যমেই দূর হতে পারে। লজ্জিত হওয়ার প্রমাণ হলো আল্লাহর সামনে নিজেকে অত্যন্ত অপরাধী মনে করা।
৯. ইমাম নববী (রহ.)
মুসলিম উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ ও হাদিস বিশারদ ইমাম নববী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব 'রিয়াদুস সালিহীন' ও 'শারহু মুসলিম'-এ লিখেছেন, আলেমদের সর্বসম্মত অভিমত হলো প্রতিটি গুনাহ থেকে তাওবা করা ওয়াজিব। আর তাওবা কবুল হওয়ার জন্য সর্বপ্রথম ও প্রধানতম শর্তটি হলো বান্দা কৃত গুনাহের জন্য চরমভাবে লজ্জিত হবে।
১০. হযরত আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.)
উপমহাদেশের যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) বুখারি শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'ফয়জুল বারী'-তে লিখেছেন, গুনাহের পর দুঃখ ও লজ্জা হওয়াই প্রকৃত মুমিন হওয়ার প্রধান মাপকাঠি। মানুষ যখন গুনাহের জন্য মনে মনে লজ্জিত হয়, তখন তার হাকিকি ঈমান তাকে পুনরায় সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করে।
গুনাহের কালো দাগ যেমন অন্তরকে কলুষিত করে, তেমনি তাওবা ও লজ্জিত হওয়ার চোখের পানি সেই কলঙ্ক ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেয়। আল্লাহর রহমতের দুয়ার খোলার প্রধান চাবিই হলো অন্তরের এই পবিত্র অনুশোচনা।