মুহাম্মদ আল আমিন,(এমএ): মদীনা মুনাওয়ারার বুকে হাজার বছর ধরে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদে নববী-বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের স্থানগুলোর একটি। এই পবিত্র মসজিদের পূর্ব দিকের দেয়ালে রয়েছে এমন একটি দরজা, যাকে ঘিরে জড়িয়ে আছে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্মৃতি ও আবেগ। ইতিহাসে এই দরজার নাম—‘বাবে জিবরাইল’, অর্থাৎ জিবরাইলের দরজা। শুধু একটি স্থাপত্য-নিদর্শন নয়, এই দ্বার যেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও ফেরেশতাকুলের সরদার হজরত জিবরাইল (আ.)-এর মাঝে গড়ে ওঠা এক স্বর্গীয় সম্পর্কেরই জীবন্ত প্রতীক-যে সম্পর্কের সূত্র ধরেই মানবজাতি পেয়েছে আল-কুরআনের আলো।
ইসলামি বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে হজরত জিবরাইল (আ.) প্রায়ই এই নির্দিষ্ট দরজা দিয়েই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হতেন। এ কারণেই এই প্রবেশপথ ইসলামি ঐতিহ্যে এমন এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে, যা অন্য কোনো দরজার নেই।
শুধু জিবরাইল (আ.)-এর আগমনের স্মৃতিই নয়, ঐতিহাসিক বিবরণ অনুসারে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও নিয়মিতভাবে এই দরজা দিয়েই মসজিদে প্রবেশ করতেন ও বের হতেন। এ কারণে এক সময় এই পথকে ‘বাবে আন-নবী’ বা নবীর দরজা নামেও ডাকা হতো।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত এক ঘটনায় উঠে এসেছে এই দরজার ঐতিহাসিক গুরুত্ব। খন্দকের যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন অস্ত্র খুলে গোসলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই হজরত জিবরাইল (আ.) এই দরজার কাছে এসে উপস্থিত হন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে বনু কুরাইজা গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ পৌঁছে দেন। উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) নিজের ঘরের ভেতর থেকে ধুলোবালি মাখা অবস্থায় জিবরাইল (আ.)-কে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে কথা বলতে দেখেছিলেন বলে বর্ণিত আছে।
সময়ের প্রবাহে এই দরজার নামের ক্ষেত্রেও এসেছে পরিবর্তন। ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত ওসমান (রা.)-এর বাসগৃহ এই দরজার ঠিক বিপরীতে অবস্থিত থাকায়, ইতিহাসের একটি পর্যায়ে একে ‘বাবে ওসমান’ নামেও অভিহিত করা হতো।
মসজিদে নববীর ব্যাপক সম্প্রসারণ ও আধুনিক সংস্কারকাজের ধারাবাহিকতায় দরজাটির আদি কাঠামোয় কিছু পরিবর্তন এসেছে ঠিকই, কিন্তু বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে এর আধ্যাত্মিক মর্যাদা আজও অটুট। বর্তমান দরজার ওপরের অংশে নিপুণ ক্যালিগ্রাফিতে খোদাই করা পবিত্র আয়াতসমূহ আজও এই স্থানটির অনন্য মর্যাদা ও হজরত জিবরাইল (আ.)-এর মর্যাদার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় প্রতিটি জিয়ারতকারীর হৃদয়ে।
সূত্র: বিভিন্ন ইসলামি ঐতিহাসিক বর্ণনা ও সহিহ বুখারি