ক্রীড়া প্রতিবেদক: নির্ধারিত ৯০ মিনিট ছিল গোলশূন্য। অতিরিক্ত সময়ের খেলা শুরুর কিছুক্ষণ পরই মাঠের ডান প্রান্ত থেকে আসা ক্রসে আলতো ছোঁয়ায় বল জালে জড়ালেন ফেরান তোরেস। আর তাতেই লুসাইল স্টেডিয়ামে রচিত হলো স্প্যানিশ ফুটবলের নতুন মহাকাব্য। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপ ঘরে তুলল দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা।
স্পেনের এই ঐতিহাসিক জয়ে কোনো নাটকীয়তা ছিল না, ছিল না কোনো শেষ মুহূর্তের রোমাঞ্চ। বরং পুরো আসর জুড়ে নান্দনিক ফুটবল খেলা আর্জেন্টিনা ফাইনালের মহারণে স্পেনের মহাপরাক্রমশালী ফুটবলের সামনে ন্যূনতম প্রতিরোধও গড়তে পারেনি। রদ্রি ও লামিনে ইয়ামালদের একক আধিপত্যের ম্যাচে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের রীতিমতো কোণঠাসা করে জিতেছে ইউরোপের সেরা দলটি।
স্প্যানিশ শিবিরের বিশ্বজয়ের বাঁধভাঙা উল্লাসের ঠিক বিপরীত চিত্র তখন আর্জেন্টিনা শিবিরে। একই মঞ্চে তখন ট্রফি হারানোর বেদনায় নীল লিওনেল মেসি। কাতার বিশ্বকাপের মহানায়কের কান্নাভেজা চোখ স্তব্ধ করে দিয়েছিল বিশ্বজুড়ে কোটি আলবিসেলেস্তে সমর্থককে। এই আসরেও ৮টি গোল আর ৪টি অ্যাসিস্ট করে দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন মহাতারকা। কিন্তু ফাইনালের মঞ্চে দলগত চরম ব্যর্থতায় নিজের শেষ বিশ্বকাপ অধ্যায়টা জয় দিয়ে রাঙাতে পারলেন না মেসি।
বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও লজ্জার রেকর্ড গড়েছে আর্জেন্টিনা। পুরো ১২০ মিনিটের ম্যাচে স্পেনের গোলপোস্ট লক্ষ্য করে একটি শটও নিতে পারেনি তারা। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান রাখার ইতিহাস শুরু হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো ফাইনালিস্ট দলের ক্ষেত্রে এমন আক্রমণাত্মক বন্ধ্যাত্বের ঘটনা এটাই প্রথম। লিওনেল মেসির মতো ফুটবলার যে দলে আছেন, তাদের এমন পারফরম্যান্স ছিল বড্ড বেমানান।
মাঠের পরিসংখ্যানে স্পেন ছিল পুরোপুরি অপ্রতিরোধ্য। ইউরো চ্যাম্পিয়ন বনাম বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের এই লড়াইয়ে স্প্যানিশরা আক্রমণ চালিয়েছে একের পর এক। পুরো ম্যাচে স্পেনের নেওয়া ২০টি শটের মধ্যে ১২টিই ছিল অন-টার্গেট। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রেখে প্রথমার্ধে তাদের নিজেদের ডি-বক্সে পর্যন্ত ঢুকতে দেয়নি স্পেনের মিডফিল্ড।
ফাইনালে স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমনকে কোনো সেভই করতে হয়নি, কারণ বল তাঁর পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগই পায়নি। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার পক্ষে ম্যাচে সবচেয়ে বেশিবার বল স্পর্শ (টাচ) করতে হয়েছে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে। আকাশী-নীলদের বল দখলের হার ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশ, যা ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সর্বনিম্ন বল দখলের রেকর্ড।
ম্যাচের যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজ ফাউল করে লাল কার্ড দেখলে ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। ফলে লড়াই আরও কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ দিকে মার্তিনেজ দুর্দান্ত কিছু সেভ করে দলকে ম্যাচে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও অতিরিক্ত সময়ের শুরুতে ফেরান তোরেসের নিখুঁত ফিনিশিং আর ঠেকাতে পারেননি। অফসাইড ও ফাউলের কারণে স্পেনের আরও দুটি গোল বাতিল না হলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত।
পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার এক অনন্য কীর্তি গড়ল স্পেন। লুইস দে লা ফুয়েন্তের হাত ধরে রক্ষণ ও আক্রমণের এক দারুণ মেলবন্ধনে বিশ্বফুটবলের সিংহাসন পুনরুদ্ধার করল 'লা রোহা'রা।