আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বন্যার পানি কিছুটা নামতে শুরু করেছে। কিন্তু নেপালের দুর্গত এলাকাগুলোতে কমেনি মানুষের দুর্ভোগ। ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়শিবিরে ঠাঁই নেওয়া হাজারো মানুষ এখন লড়ছেন খাবার, সুপেয় পানি ও জরুরি ওষুধের সংকটের সঙ্গে। কোথাও চিকিৎসার জন্য ওষুধ নেই, কোথাও পানির ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এর মধ্যেই বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে নিখোঁজের তালিকা।
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত ৭৯৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজার ৪৮ জন। ধ্বংসস্তূপ ও কাদায় আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে দিন-রাত অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
বন্যার ভয়াবহ স্রোত থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন ত্রিশূলী বাজারের বাসিন্দা রেখা দেবী গোঁসাই। কিন্তু বন্যা তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে ঘরবাড়ি ও জীবিকার শেষ অবলম্বন-চারটি দোকান।
দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন রেখা। বন্যার সময় জীবন বাঁচিয়ে বের হতে পারলেও সঙ্গে নিতে পারেননি প্রয়োজনীয় ওষুধ। এখন পরিবারের সঙ্গে আশ্রয়শিবিরে দিন কাটছে তাঁর।
রেখার ছেলে রঘুবীর জানান, টানা তিন দিন তাঁর মা কোনো ওষুধ পাননি। পাশের ত্রিশূলী হাসপাতালেও প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই।
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি এতটাই সংকটপূর্ণ যে একই আশ্রয়শিবিরে থাকা এক নারীর প্রসববেদনা উঠলে বহু চেষ্টার পর তাঁকে হেলিকপ্টারে কাঠমান্ডু পাঠাতে হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না, আবার বন্যায় রাজধানীর সঙ্গে সড়ক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
আরেকটি আশ্রয়শিবিরে রয়েছেন কপিলা পারিয়ার। তাঁর ৬২ বছর বয়সী মা তীব্র হাঁপানিতে ভুগছেন। নিয়মিত কয়েকটি ওষুধ তাঁর জন্য অত্যন্ত জরুরি হলেও সেগুলো সংগ্রহ করতে পারছেন না কপিলা।
ত্রিশূলী হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মহেশ্বর যাদব জানান, উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যাটেনোলল ও লোসার্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ওষুধও হাসপাতালে নেই।
হাসপাতালের তথ্য কর্মকর্তা রিকেশ রানা বলেন, আশ্রয়শিবিরে থাকা অনেক রোগীর নিয়মিত ওষুধ প্রয়োজন হলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় তাঁদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় স্বাস্থ্যবীমা কর্মসূচিও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
বন্যায় শুধু ঘরবাড়িই ভেসে যায়নি, ভেঙে পড়েছে পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্যানেল ও টুপচে এলাকার পানির পাইপলাইন ধসে যাওয়ায় হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
বাগটার এলাকার তিনটি আশ্রয়শিবির-ভৈরুং মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কভার্ড হল ও বেথান একাডেমিতে প্রায় এক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু সেখানে সুপেয় পানির সংকটের পাশাপাশি শৌচাগারের ব্যবস্থাও অপ্রতুল।
ত্রিশূলী হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট রাজেন্দ্র লামা সতর্ক করে বলেছেন, এমন পরিস্থিতিতে কলেরা, ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আশ্রয়শিবিরগুলোতে খাবারের সংকটও তীব্র। দুর্গতদের অভিযোগ, যে পরিমাণ খাবার দেওয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। খাবারে পুষ্টির ঘাটতিও রয়েছে।
অন্তঃসত্ত্বা নারী, প্রসূতি, শিশু ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তদের জন্য এমন খাবার আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবারের হাতে নগদ অর্থ নেই। ঘরবাড়ির পাশাপাশি হারিয়েছেন পোশাক, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও জীবিকার উৎস।
দুর্যোগের পর বাজার ও দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার সুযোগও সীমিত। ফলে আশ্রয়শিবিরে থাকা পরিবারগুলোর সামনে এখন অনাহার, রোগ আর অনিশ্চয়তা-তিনটিই বড় চ্যালেঞ্জ।
নেপাল সরকার ও তিব্বত প্রশাসনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৯৭ জনে। নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজার ৪৮ জন।
নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির ভূখণ্ডে ৫৯২ বিদেশি নাগরিকসহ ২ হাজার ৫০২ জন এখনো নিখোঁজ। নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮১ জনে।
চীনের স্বায়ত্তশাসিত তিব্বত অঞ্চলে ১৬ জন নিহত এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি। নিখোঁজদের মধ্যে ২৩ দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১০৪ জন নেপালি, ৪৯ জন ভারতীয়, ৩৩ জন লাটভিয়ান, ১৮ জন মার্কিন ও ১৫ জন ব্রিটিশ নাগরিক।
তিব্বতে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশের সুযোগ সীমিত থাকায় সেখানকার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দুর্যোগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অধ্যায়গুলোর একটি তৈরি হয়েছে হিমালয়ের পাদদেশে আপার ত্রিশূলী-৩এ ও ৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায়। কাদায় পূর্ণ সুড়ঙ্গে শত শত শ্রমিক আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রায় ৯৩৪ জন জলবিদ্যুৎ শ্রমিক নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কতজন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা আছেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
নেপালি সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা ভারী ড্রিলিং মেশিন, হাইড্রোলিক কাটার ও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ব্যবহার করে সুড়ঙ্গের ওপরের অংশে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। সামরিক হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ৩৫ জন এবং পুলিশের তথ্যমতে প্রায় ২০০ শ্রমিক সেখানে আটকা থাকতে পারেন।
উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গে নেমে ডাকাডাকি করলেও এখন পর্যন্ত ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অভিযানে নেপালি সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভারত ও চীনের উদ্ধারকারী দলও অংশ নিয়েছে।
এদিকে দক্ষিণ নেপালের ভারতপুর ও পোখরা এলাকার হাসপাতালগুলোতে স্বজনদের ভিড় বাড়ছে। এলইডি স্ক্রিনে প্রদর্শিত মরদেহের ছবি দেখে প্রিয়জনকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
অনেক মরদেহ এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে চেহারা দেখে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই কারও কানের দুল, গলার চেইন, স্কুলের টাই কিংবা শরীরে থাকা ট্যাটুই হয়ে উঠছে পরিচয় শনাক্তের শেষ সূত্র।
নেপালের এই ভয়াবহ দুর্যোগে বন্যার পানি হয়তো ধীরে ধীরে নামছে, কিন্তু দুর্গত মানুষের সংকট যেন আরও গভীর হচ্ছে। একদিকে নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষা, অন্যদিকে খাবার-পানি ও চিকিৎসার অভাব-সব মিলিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এখন প্রতিটি দিনই হয়ে উঠছে নতুন এক পরীক্ষা।