আন্তর্জাতিক ডেস্ক: হিমালয়ের কোলে অবস্থিত নেপালে হিমবাহ ধস ও পাহাড়ি ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬২ জনে। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশটিতে আটকা পড়ে নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৪০৩ জন পর্যটক, যাদের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক। দুর্গম পার্বত্য এলাকায় উদ্ধার অভিযান এখনও চলমান থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।

নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্লাবিত নদী ও স্রোতে ভেসে আসা মরদেহের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে চিতওয়ান জেলায়—সেখান থেকে এ পর্যন্ত ৬৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া নাওয়ালপরাসি ইস্ট এলাকা থেকে উদ্ধার হয়েছে আরও ২৬ জনের লাশ। উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে স্থানীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর অন্তত ২৮ জন পুলিশ সদস্যও নিখোঁজ হয়ে পড়েছেন বলে প্রশাসন নিশ্চিত করেছে।
পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চিতওয়ানে নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় এলাকাটিকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। গত বুধবার তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়াসহ পার্শ্ববর্তী একাধিক জেলায় এই আকস্মিক দুর্যোগ আঘাত হানে।
নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, নিখোঁজ ৪০৩ পর্যটকের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক, যাদের মধ্যে ১৪২ জনই ভারতীয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ৫৪ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন পর্যটকের এখনো কোনো হদিস মেলেনি। নিখোঁজ বিদেশিদের তালিকায় আরও রয়েছেন মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকরা।
নেপাল সীমান্তবর্তী চীনের তিব্বত অঞ্চলেও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির বরাতে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী গিরং কাউন্টিতে নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫৮ জনে, যাদের মধ্যে ২৬০ জনই বিদেশি নাগরিক। তবে চীনে এখন পর্যন্ত ৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক ও পর্যটন সীমান্ত পথটি ধসের কারণে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
দুর্ঘটনার সময় তীব্র কম্পন অনুভূত হওয়ায় প্রাথমিকভাবে একে ভূমিকম্পজনিত দুর্যোগ মনে করা হয়েছিল। তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) পরে জানায়, বিশাল আকারের হিমবাহ ধস এবং পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদা-পাথরের তীব্র স্রোতের কারণেই ভূপৃষ্ঠ কেঁপে ওঠে এবং এই প্রলয়ংকরী বন্যার সৃষ্টি হয়।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই মর্মান্তিক দুর্যোগে গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এই প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার ঘটনায় তার হৃদয় ভারাক্রান্ত এবং প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে পুরো জাতি স্তম্ভিত ও গভীরভাবে মর্মাহত। দুর্যোগটিকে তিনি ‘আকস্মিক’ ও ‘ভয়াবহ’ বলে আখ্যায়িত করেন এবং জানান, উদ্ধার অভিযান শুরু করতে সরকার কোনো বিলম্ব না করে তাৎক্ষণিকভাবে সব ধরনের সম্পদ ও সক্ষমতা কাজে লাগিয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোয় ইতোমধ্যে প্রায় আট টন জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে এবং উদ্ধারকাজ আরও জোরদার করা হয়েছে।
ভোটকোশী নদীর তীরবর্তী রসুয়া ও নুয়াকোট জেলার বেশ কয়েকটি জনবসতি এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকাগুলো তুলনামূলক জনবিরল হলেও সেখানকার সড়কগুলো নেপাল-চীন বাণিজ্যের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বন্যার তোড়ে ওই এলাকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, মহাসড়ক ও সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে, যা উদ্ধার তৎপরতা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সূত্র: নেপাল পুলিশ, নেপাল পর্যটন মন্ত্রণালয়, ইউএসজিএস, সিসিটিভি ও এনডিটিভি