মুহাম্মদ আল আমিন (এমএ): সপ্তাহের সাতটি দিনের মধ্যে জুমাবার মুসলিম উম্মাহর কাছে এক পরম পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ দিন। ইসলামি পরিভাষায় একে বলা হয় সাপ্তাহিক ঈদের দিন। আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা ঘটে এই দিনটিতে। পবিত্র কোরআনে এই দিনের নামানুসারেই নাজিল হয়েছে একটি স্বতন্ত্র সুরা-সুরা আল-জুমুআহ-যা এর ঐতিহাসিক ও রুহানি গুরুত্বকে চিরস্থায়ী মর্যাদা দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেন, জুমার আজান শোনামাত্র যেন সব দুনিয়াবি ব্যস্ততা ও কেনাবেচা ছেড়ে মসজিদের পথে ছুটে যাওয়া হয়, এতেই রয়েছে মুমিনের জন্য প্রকৃত কল্যাণ (সুরা জুমুআহ, আয়াত: ৯)।
দিনগুলোর নেতা: সূর্য উদিত হয় এমন সব দিনের মধ্যে জুমাবার সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহর কাছে এর মর্যাদা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার চেয়েও অধিক (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১০৮৪)।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য: এই দিনেই হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়, জান্নাতে স্থান দেওয়া হয় এবং পরে পৃথিবীতে পাঠানো হয়। এমনকি কিয়ামতও সংঘটিত হবে এই জুমার দিনেই (সহিহ মুসলিম: ৮৫৪)।
কবরের আজাব থেকে সুরক্ষা: জুমার দিন বা রাতে মৃত্যুবরণকারী মুমিনকে আল্লাহ কবরের ফিতনা থেকে রক্ষা করেন (মুসনাদে আহমাদ: ৬৬৪৬)।
জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো একাগ্রতার সাথে জুমার নামাজ আদায় করা। এর জন্য কিছু সুন্নাহসম্মত প্রস্তুতি ও শিষ্টাচার মেনে চলা জরুরি-
১. ভালোভাবে গোসল করে পবিত্রতা অর্জন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন উত্তম পোশাক পরিধান ও সুগন্ধি ব্যবহার করা।
২. যানবাহনে না চড়ে হেঁটে প্রথম ওয়াক্তেই মসজিদে উপস্থিত হওয়া।
৩. খুতবা চলাকালে অনর্থক কথা বা কাজ থেকে বিরত থেকে ইমামের কাছাকাছি বসে মনোযোগসহ খুতবা শোনা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সুন্নাহ অনুযায়ী গোসল করে সকাল সকাল হেঁটে মসজিদে যায়, ইমামের কাছে বসে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে এবং অহেতুক আচরণ থেকে বিরত থাকে-তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছরের নফল রোজা ও নফল নামাজের সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হয় (সুনানে আবু দাউদ, ৩৪৫)।
জুমার আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আমল
সুরা কাহফ তিলাওয়াত: জুমার দিনে সুরা কাহফ পাঠ করলে এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত বিশেষ নূর আলোকিত হয়ে থাকে (সুনানে বায়হাকি: ৬২০৯)।
কবুলিয়াতের মুহূর্তে দোয়া: জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যখন দোয়া করলে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। অধিকাংশ আলেমের মতে, আসরের পর থেকে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়টিই দোয়া কবুলের প্রধান মুহূর্ত (সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৮)।
অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ: জুমার দিনে নবীজি (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠের নির্দেশ রয়েছে, কারণ এই দিনের দরুদ সরাসরি তাঁর দরবারে পেশ করা হয় (বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা: ৩/২৪৯)।
জুমার দিন কেবল সপ্তাহের একটি সাধারণ ছুটির দিন নয়-এটি ঈমান নবায়নের এবং আত্মিক উন্নয়নের এক বিশাল সুযোগ। পবিত্রতা অর্জন, যথাসময়ে মসজিদে উপস্থিতি, একাগ্র নামাজ, সুরা কাহফ তিলাওয়াত, নির্দিষ্ট মুহূর্তে দোয়া এবং দরুদ পাঠের মাধ্যমে এই দিনের পূর্ণ বরকত ও রহমত অর্জন করা প্রতিটি সচেতন মুসলিমের কর্তব্য।
মুহাম্মদ আল আমিন (এমএ): সাংবাদিক, লেখক, কলামিস্ট ও ইসলামবিষয়ক বিশেষজ্ঞ।