বিশেষ প্রতিবেদক: নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া ইউনিয়নের ছোট্র এক গ্রাম শাহচিল্লাপুর। বাইরে থেকে দেখলে নিতান্তই সাধারণ মনে হলেও এই নিভৃত জনপদেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন মুসলিম বাংলার এক প্রাতঃস্মরণীয় শাসক -ইলিয়াস শাহী রাজবংশের তৃতীয় সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। চতুর্দশ শতকের এই শাসক শুধু রাজনীতি ও ন্যায়বিচারের জন্যই স্মরণীয় নন, তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনাচরণ ও দ্বীনি অনুরাগের কারণে স্থানীয়দের কাছে তিনি আজও এক শ্রদ্ধেয় দরবেশ হিসেবে বিবেচিত।
১৩৮৯ সালে সিংহাসনে বসেন গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। প্রায় দুই দশকের শাসনামলে তাঁর মনোযোগ ছিল রাজ্যবিস্তারের চেয়ে সুশাসন, ন্যায়বিচার আর জ্ঞানচর্চার দিকে। পিতা ও পিতামহের ধারা অনুসরণ করে তিনি আলেম-ওলামা ও সুফি-সাধকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁর সময়ে শেখ আলাউল হক ও হযরত নূর কুতুব আলমের (রহ.) মতো প্রখ্যাত সুফি সাধকদের সঙ্গে তাঁর গভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা তাঁর দ্বীনি চেতনার এক উজ্জ্বল সাক্ষ্য।
শুধু নিজ রাজ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না তিনি- পবিত্র মক্কা-মদিনার হাজি ও বাসিন্দাদের কল্যাণেও তিনি এগিয়ে আসতেন। সেখানে গিয়াসিয়া মাদ্রাসা নামে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় অর্থ সহায়তা দেন তিনি, যা আজও ইসলামি শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদানের প্রমাণ বহন করে চলেছে।
গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ নিজেও ছিলেন সাহিত্যরসিক, আরবি-ফারসি ভাষায় কবিতা লিখতেন। পারস্যের বরেণ্য সুফি কবি হাফিজের সঙ্গে তাঁর পত্রালাপের কাহিনি আজও লোকমুখে কিংবদন্তির মতো প্রচলিত - সুলতান একটি অসম্পূর্ণ কবিতার চরণ পাঠিয়েছিলেন হাফিজের কাছে, আর হাফিজ তা সম্পূর্ণ করে ফিরতি জবাব পাঠান। একজন শাসক ও একজন সুফি কবির মধ্যকার এই বিরল সংযোগ ইতিহাসের পাতায় আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে।
সুলতানের ইন্তেকালের পর তাঁকে সমাহিত করা হয় শাহচিল্লাপুরেই। স্থানীয়দের কাছে 'কালো দরগা' নামে পরিচিত এই সমাধি নির্মিত হয়েছে নিখুঁত কালো কষ্টিপাথরে, যার গায়ে খোদাই করা আছে সূক্ষ্ম শিকল ও ঝুলন্ত ঘণ্টার নকশা। ১৯২০ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর একে পুরাকীর্তির তালিকাভুক্ত করে, আর সর্বশেষ সংস্কার হয় ১৯৮৫ সালে। কিন্তু এই স্থাপত্য শুধু ইতিহাসের নিদর্শনই নয় -এটি আজও ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে এক রুহানি আবেগের আধার।
নারায়নগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মানুষের কাছে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ নিছক ইতিহাসের এক সুলতান নন - তাঁর সুফিচেতনা ও খোদাভীতির কারণে তিনি বিবেচিত হন উচ্চস্তরের এক দরবেশ হিসেবে। এই গভীর ভক্তি ও ভালোবাসার টানেই প্রতি বছর তাঁর মাজারে অনুষ্ঠিত হয় বাৎসরিক উরস, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য ভক্ত ও আলেম। স্বপ্নাদেশ পেয়ে মাজার জিয়ারতে ছুটে আসার মতো লোককাহিনিও এই স্থানের আধ্যাত্মিক মর্যাদাকে করেছে আরও গভীর ও রহস্যময়।
আজও অনেক পরিবার সন্তানদের নিয়ে এই মাজারে আসেন -বাংলার ইসলামি ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ঘটাতে। ইসলামি মূল্যবোধ, সুশাসন আর আলেম-ওলামাদের সাহচর্যে সমৃদ্ধ সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের জীবন আমাদের শেখায় - ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও কীভাবে দ্বীন ও দাওয়াতের প্রতি অনুরাগী থাকা যায়। শাহচিল্লাপুরের এই নিভৃত গ্রাম তাই আজও দাঁড়িয়ে আছে সোনারগাঁয়ের এক গৌরবময় ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক হয়ে।