মুহাম্মদ আল আমিন (এম.এ): মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন-লাকাদ কানা লাকুম ফি রাসুলুল্লাহি উসওয়াতুল হাসানা, অর্থ-নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের জীবনের মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ। সূরা আল-আহযাব: ২১
মানুষের জীবনকে অর্থবহ, সুন্দর ও সঠিক পথে পরিচালিত করতে এবং উভয় জাহানের চূড়ান্ত সফলতা অর্জনে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ-এর জীবনই একমাত্র পূর্ণাঙ্গ, নিখুঁত ও অনুকরণীয় নমুনা। তাঁর জীবন ছিল পবিত্র, পরিপূর্ণ এবং প্রতিটি মুহূর্তে হিকমতে ভরপুর।
মানবজীবনে সৌন্দর্য বলতে যা কিছু কল্পনা করা যায়-উত্তম চরিত্র, কোমলতা, দয়া, ক্ষমা, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা, বিনয়, ইবাদত, আল্লাহভীতি ও মানবতার প্রতি গভীর ভালোবাসা-এই সবগুলো গুণের সর্বোৎকৃষ্ট ও পরিপূর্ণ সমাবেশ ঘটেছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনে।
তাঁর প্রতিটি দিন সুন্দর, প্রতিটি রাত সুন্দর, তাঁর প্রতিটি কথা, প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল কল্যাণ ও প্রজ্ঞায় পূর্ণ। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অনুপম, পারিবারিক জীবনে আদর্শ, সামাজিক জীবনে শ্রেষ্ঠ, আর রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায় ও প্রজ্ঞার জীবন্ত প্রতীক।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের এক বিস্ময়কর দিক হলো, আল্লাহর মহত্ব ও পবিত্রতার স্বীকৃতি তাঁর অস্তিত্বের সঙ্গে জন্মলগ্ন থেকেই জড়িয়ে ছিল। বর্ণিত আছে, তাঁর জন্মের মুহূর্তে তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল-
আল্লাহু আকবারু কাবীরা, ওয়ালহামদু লিল্লাহি কাছীরা, ওয়া সুবহানাল্লাহি বুকরাতাও ওয়া আসীলা।
অর্থাৎ: আল্লাহ অতি মহান ও মহিমান্বিত। আল্লাহর জন্য অগণিত প্রশংসা। আর সকাল-সন্ধ্যায় আমি আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি।
আল্লাহু আকবার, আলহামদুলিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ -এই তিনটি মহান ঘোষণা যেন তাঁর সমগ্র জীবনজুড়েই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তাঁর দাওয়াত ছিল আল্লাহর দিকে আহ্বান, তাঁর ইবাদত, ভালোবাসা, সংগ্রাম ও ত্যাগ-সবকিছুই ছিল একমাত্র রব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গিত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাহ্যিক সৌন্দর্য যেমন ছিল অতুলনীয়, তেমনি তাঁর অন্তরের সৌন্দর্য ছিল আরও মহিমান্বিত। তাঁর চেহারা মোবারক ছিল নূরে ভরা, কথায় মাধুর্য, আচরণে কোমলতা, চাহনিতে মায়া-মমতা। তাঁর হাসি ছিল প্রশান্তিদায়ক, কণ্ঠ হৃদয়স্পর্শী, আর চরিত্র ছিল সর্বোত্তম। সকালে আমি বলবো সুবহানাল্লাহ, সন্ধ্যায় বলবো সুবহান্ল্লাহ, আমি জীবনভর বলবো সুবহানাল্লাহ,সুবহানাল্লাহ,সুবহানাল্লাহ। এতো দিল পবিত্র।
হজরত জাবির ইবনে সামুরা (রা.), এর বর্ণনায় এসেছে, এক পূর্ণিমার রাতে খোলা আকাশের নিচে বসে সাহাবিগণ একবার আকাশের চাঁদের দিকে তাকাচ্ছিলেন, আর একবার রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নূরানী চেহারার দিকে। অতঃপর তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! আমার কাছে রাসূলুল্লাহ (সা.) এই পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর।
রুবাইয়্যি বিনতে মুআউয়িয (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ ﷺ -কে কেমন দেখেছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে মহিলা সাহাবি বলেছিলেন, তুমি যদি তাঁকে দেখতে, তবে মনে হতো তাঁর চেহারার মাঝে যেন ভোরের সূর্য উদিত হয়ে আছে!
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে নূর এবং সুস্পষ্ট কিতাব।- সূরা আল-মায়িদাহ, ১৫
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন ছিল হেদায়াতের নূর। তাঁর শিক্ষা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়, তাঁর সুন্নাহ পথহারা জীবনকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনে। একজন মুমিন যখন তাঁর সুন্নাহকে নিজের জীবনে ধারণ করেন, তখন তাঁর কথা, কাজ, আচার-আচরণ ও চরিত্রে ইসলামের সৌন্দর্য প্রতিফলিত হতে থাকে।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন। - সূরা আলে ইমরান: ৩১
আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি শুধু মুখের কথা নয়। এই ভালোবাসা অর্জনের একমাত্র পথ হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রকৃত অনুসরণ। আমরা যদি সত্যিই আল্লাহকে ভালোবাসি, তাহলে আমাদের নামাজ হবে তাঁর শেখানো পদ্ধতিতে, আমাদের চরিত্র হবে তাঁর চরিত্রের আদলে, পরিবার পরিচালনা হবে তাঁর আদর্শে, ব্যবসা-বাণিজ্যে থাকবে তাঁর সততা, সামাজিক আচরণে থাকবে তাঁর দয়া-বিনয়, আর মানুষের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে থাকবে তাঁর কোমলতা ও উত্তম আচরণ। কারণ তিনি শুধু একজন নবী নন-তিনি আমাদের জীবন গঠনের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষক।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আগে অগ্রসর হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।-সূরা আল-হুজুরাত: ১
এই সূরাতেই আল্লাহ তায়ালা আরও শিক্ষা দিয়েছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে যেন আমাদের কণ্ঠস্বরও তাঁর কণ্ঠের ওপর উচ্চ না হয়। এ থেকে বোঝা যায়, তাঁর প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি সম্মান, শ্রদ্ধা ও আদবও ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের অন্তরে এমন ভালোবাসা তৈরি করতে হবে, যার কারণে আমরা তাঁর সুন্নাহকে ভালোবাসব এবং তাঁর দেখানো পথে চলতে প্রকৃত আনন্দ অনুভব করব।
হে আল্লাহর রাসূল ﷺ, আমরা আপনাকে ভালোবাসি। আমরা আপনার দেখানো পথকে ভালোবাসি-কারণ আপনিই আমাদের সেই পথ দেখিয়েছেন, যে পথে চললে আমরা আমাদের রবের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে আল্লাহকে ডাকতে হয়, কীভাবে ইবাদত করতে হয়, কীভাবে পিতা-মাতার সঙ্গে আচরণ করতে হয়, কীভাবে স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের হক আদায় করতে হয়, কীভাবে প্রতিবেশীর সঙ্গে থাকতে হয়, কীভাবে দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়-এবং কীভাবে একজন সত্যিকারের মানুষ ও মুমিন হয়ে উঠতে হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা শুধু মুখে প্রকাশের বিষয় নয়, এই ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ হলো তাঁর সুন্নাহকে জীবনে ধারণ করা। আমাদের হৃদয়ের ভাষা হোক- আমি আল্লাহকে ভালোবাসি, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ভালোবাসি, আমি তাঁর সুন্নাহকে ভালোবাসি, আমি তাঁর দেখানো পথে চলতে চাই।
আমাদের জীবনে যদি তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে আমাদের ঘর সুন্দর হবে, পরিবার সুন্দর হবে, সমাজ সুন্দর হবে এবং আমাদের অন্তরও সুন্দর হয়ে উঠবে।
স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন, ক্বুল ইন কুনতুম তুহিব্বূনাল্লাহা ফাত্তাবিঊনী ইউহবিবকুমুল্লাহু ওয়া ইয়াগফির লাকুম জুনূবাকুম, ওয়াল্লাহু গফূরুর রহীম।
অর্থ:- বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো, তবে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আলে ইমরান: ৩১)।
আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি কেবল মুখে নয়; আমাদের নামাজ, পরিবার পরিচালনা, ব্যবসায় সততা এবং সামাজিক ব্যবহারে তাঁর প্রজ্ঞাময় সুচরিত্র ও কোমলতার প্রতিফলনের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে। সূরা আল-হুজুরাতে আল্লাহ তাআলা আদেশ দিয়েছেন, নবীজি (ﷺ)-এর সামনে যেন আমাদের কণ্ঠস্বরও উচ্চ না হয়। এটি প্রমাণ করে যে, কেবল ভালোবাসাই নয়, তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ আদব, সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনও ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মাওলানা রুমি যেমনটি উপলব্ধি করেছিলেন-আল্লাহর জিকির ও ভালোবাসায় অন্তরে ঐশ্বরিক সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। কায়নাতের সবচেয়ে সুন্দর সত্তা হযরত মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পথ অনুসরণই রবের সেই প্রিয় পাত্র হওয়ার একমাত্র উপায়।
কুরআন পাকে আল্লাহ বলেন- লাকাদ যা আকুম মিনাল্লাহি নূর, (উচ্চারণ: ক্বাদ জাআকুম মিনাল্লাহি নূরুন) পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মায়েদা-১৫ , মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আজিমুশন নুর।
অর্থ- নিশ্চয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট এসেছে এক মহান নূর।
রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর কাছে নূরের দোয়া করতেন। হাদিসে তাঁর একটি দোয়া বর্ণিত হয়েছে-হে আল্লাহ! আমার অন্তরে নূর দিন, আমার শ্রবণে নূর দিন, আমার দৃষ্টিতে নূর দিন, আমার ডানে নূর দিন, আমার বামে নূর দিন, আমার সামনে নূর দিন, আমার পেছনে নূর দিন এবং আমার জন্য নূর বৃদ্ধি করুন।
এই দোয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন মুমিনের জীবনে আল্লাহর হেদায়াতের নূর কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-আল্লাহ ঈমানদারদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।-সূরা আল-বাকারা, ২৫৭
এই নূর হলো ঈমানের নূর, হেদায়াতের নূর, সত্যের নূর। যে নূর মানুষকে ভুল পথ থেকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনে এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রশংসা লিখে বা বলে শেষ করা সম্ভব নয়। তিনি ছিলেন আল্লাহর মনোনীত সর্বশেষ নবী, মানবজাতির জন্য রহমত এবং উত্তম আদর্শের সর্বশ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবন ছিল আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ, তাঁর চরিত্র ছিল কুরআনের জীবন্ত ব্যাখ্যা, তাঁর আচার-আচরণ ছিল মানবতার জন্য শিক্ষা। তাঁর ভালোবাসা, অশ্রু ও দোয়া-সবকিছু ছিল উম্মতের কল্যাণের জন্য।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অনুকরণীয় জীবনই আমাদের জন্য একমাত্র আলো। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ইবাদত করতে হয়, কীভাবে মা-বাবার খিদমত করতে হয়, পরিবার ও প্রতিবেশীর হক আদায় করতে হয় এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সত্যিকারের মুমিন হতে হয়।
আমাদের সকাল, সন্ধ্যা, পরিবার, চরিত্র ও সমাজ যদি তাঁর সুন্নাহর আলোয় আলোকিত হয়, তবেই গড়ে উঠবে এক আদর্শ ও সুন্দর জীবন।
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে আপনার ও আপনার প্রিয় হাবীব (ﷺ)-এর প্রকৃত ভালোবাসা দান করুন। তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দিন এবং কিয়ামতের ময়দানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শাফায়াত নসিব করুন। আমীন।
মুহাম্মদ আল আমিন (এম.এ), সাংবাদিক, লেখক, কলামিস্ট।