নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজবাড়ী : ঈদের আনন্দ নিয়ে কর্মস্থলে ফেরার পথে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে এক মর্মান্তিক সলিল সমাধি ঘটেছে। বুধবার বিকেলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ৩০ জন যাত্রী। মুহূর্তের অসতর্কতায় আনন্দময় ফিরতি যাত্রা রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর বাসটি বুধবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর পন্টুনে ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বাসটি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তীব্র গতিতে পন্টুন পেরিয়ে সরাসরি উত্তাল পদ্মায় পড়ে যায়। চোখের পলকেই বাসটি নদীর প্রায় ৮০ ফুট গভীরে তলিয়ে যায়। বাসে থাকা প্রায় ৫০ থেকে ৫৬ জন যাত্রীর মধ্যে মাত্র ৭-৮ জন জানালা দিয়ে বেরিয়ে সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হন। বাকিরা বাসের ভেতরেই আটকা পড়েন।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিস, নৌ-পুলিশ, সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্ধারকারী দল। তবে কালবৈশাখীর ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। রাত সোয়া ১১টার দিকে বিআইডব্লিউটিএ-এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ নদীর গভীর থেকে বাসটি টেনে তুলতে শুরু করলে একের পর এক নিথর দেহ বেরিয়ে আসতে থাকে।
ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া তথ্যমতে, উদ্ধারকৃত ১৮টি মরদেহের মধ্যে ১০ জন নারী, ২ জন শিশু এবং ৬ জন পুরুষ রয়েছেন। মৃতদের মধ্যে রেহেনা আক্তার (৬০) ও মর্জিনা বেগম (৫৫) সহ বেশ কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।
দৌলতদিয়া ঘাট এখন এক শোকাতুর জনপদ। নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় নদীর তীরে বসে থাকা মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে চারপাশ। ৭ মাসের শিশু আরশান ও স্ত্রী আয়েশাকে হারিয়ে পাথর হয়ে গেছেন নুরুজ্জামান। তিনি বিলাপ করে বলছিলেন, "আমি আর বড় মেয়েটা বাস থেকে একটু নামলাম ফেরি দেখার জন্য, আর আমার কলিজার টুকরাটা মা’র সাথে নিমিষেই তলিয়ে গেল। কিছুই করতে পারলাম না!" এমন অসংখ্য হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে আছে উত্তাল পদ্মা।
ঘটনার ভয়াবহতায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকগণ। রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে টেলিফোনে ঘটনার খোঁজ নিয়েছেন এবং উদ্ধার অভিযান জোরদার করতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ এবং পুলিশের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে, পন্টুনে ওঠার সময় যান্ত্রিক ত্রুটি অথবা চালকের অসতর্কতার কারণেই এই প্রাণহানি ঘটেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, নিখোঁজদের সন্ধানে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এখনও তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে !