পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল এসেছেন সবাই ১০ই মহররমে রোজা রেখেছিলেন

পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল এসেছেন সবাই  ১০ই মহররমে রোজা রেখেছিলেন

মুহাম্মদ আল আমিন, (এমএ): মহররম মাসের ১০ তারিখ অর্থাৎ আশুরার দিনটি’ ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মহিমান্বিত। সৃষ্টির শুরু থেকে এই দিনে বহু অলৌকিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। আর এই বিশেষ দিনটির অন্যতম প্রধান ইবাদত হলো রোজা রাখা। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস এবং ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় শুধু আমাদের নবীজিই নন, বরং হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে পূর্ববর্তী প্রায় সমস্ত নবী-রাসূলগণ এই ১০ই মহররমের দিনে রোজা রেখেছিলেন।

মহান আল্লাহ তায়াআলা মহরমের ১০ তারিখে অনেক নবী-রাসূলকে বড় বড় বিপদ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং বিশেষ নিয়ামত দান করেছিলেন। আর আল্লাহর সেই অশেষ অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁরা এই দিনে রোজা রাখতেন।

১. হযরত নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি ও রোজা
মহাপ্লাবনের পর হযরত নূহ (আ.)-এর কিশতি (নৌকা) যখন জুদি পাহাড়ে এসে ভিড়েছিল, সেই ঐতিহাসিক দিনটি ছিল ১০ই মহররম। আল্লাহর এই অশেষ রহমতের শুকরিয়া হিসেবে তিনি ও তাঁর সাথীগণ রোজা রেখেছিলেন।

আল্লাহ তায়াআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, আর নির্দেশ দেওয়া হলোহে পৃথিবী! তোমার পানি গিলে নাও এবং হে আকাশ! ক্ষান্ত হও। এরপর পানি হ্রাস পেল এবং কাজ শেষ হলো, আর কিশতিটি 'জুদি' পাহাড়ের ওপর স্থির হলো..." (সূরা হূদ, আয়াত: ৪৪)

মুসনাদে আহমাদের একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আশুরার দিনটি এমন একটি দিন, যে দিনে নূহ (আ.)-এর নৌকা জুদি পাহাড়ে স্থির হয়েছিল। তাই নূহ (আ.) আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য এই দিনে রোজা রেখেছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ: ৮৭১৭)

২. হযরত মূসা (আ.)-এর বিজয় ও ফেরাউনের পতন
ফেরাউনের নির্মম অত্যাচার থেকে বনী ইসরাইলকে মুক্ত করে লোহিত সাগর পার করার দিনটিও ছিল আশুরার দিন। আল্লাহ যখন অত্যাচারী ফেরাউনকে সলিল সমাধি দিলেন এবং মূসা (আ.)-কে মহাবিজয় দান করলেন, তখন মূসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই রোজা পালন করেন।

আল্লাহ তায়াআলা লোহিত সাগর দ্বিখণ্ডিত করার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আর যখন আমি তোমাদের জন্য সাগরকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলাম, অতঃপর তোমাদের রক্ষা করেছিলাম এবং ফেরাউনের অনুসারীদের ডুবিয়ে মেরেছিলাম, আর তোমরা তা দেখছিলে।" (সূরা বাকারাহ, আয়াত: ৫০)

হযরত আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় হিজরত করে মদিনায় এলেন, তখন দেখতে পেলেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। তিনি এর কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, এটি একটি মহান দিন। এই দিনে আল্লাহ মূসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। তাই মূসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোজা রেখেছিলেন। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের চেয়ে মূসা (আ.)-এর অনুসরণের ব্যাপারে আমরাই বেশি হকদার। এরপর নবীজি (সা.) নিজে রোজা রাখলেন এবং সাহাবীদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ২০০৪)

৩. সমস্ত নবী-রাসূলদের ঐতিহাসিক সুন্নাত
ইসলামী বর্ণনা ও হাদীস শাস্ত্রের গভীর বিশ্লেষণে জানা যায়, শুধু নূহ (আ.) বা মূসা (আ.) নন, বরং প্রাচীনকাল থেকেই মক্কার কুরাইশরা এবং পূর্ববর্তী বহু নবী-রাসূল এই দিনের মহিমাকে সম্মান করে রোজা রাখতেন।

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জাহেলিয়াতের যুগে কুরাইশরা আশুরার দিনে রোজা রাখত এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-ও (নবুওয়তের আগে) এ দিনে রোজা রাখতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ১৫৯২)

এছাড়া জামে তিরমিযীর একটি বর্ণনায় (হাদীস নং: ৭৫৫) উল্লেখ রয়েছে যে, আশুরার দিনটি এমন একটি দিন যাতে পূর্ববর্তী অনেক জাতির তাওবা আল্লাহ কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও বহু মানুষের তাওবা কবুল করবেন।

উম্মতে মুহাম্মদীর করণীয় ও ফজিলত
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এই রোজার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং উম্মতকে এর ফজিলত সম্পর্কে উৎসাহিত করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, আশুরার রোজা তার পূর্ববর্তী এক বছরের (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেবে।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১১৬২)

ইহুদিদের সংস্কৃতির সাথে যেন মুসলমানদের ইবাদতের বাহ্যিক মিল না যায়, সেজন্য নবীজি (সা.) আশুরার মূল রোজার সাথে আগে বা পরে আরেকটি রোজা মিলিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা আশুরার রোজা রাখো এবং এতে ইহুদিদের বিরোধিতা করো। আশুরার আগের দিন বা পরের দিন (মিলিয়ে) আরও একটি রোজা রাখো। (মুসনাদে আহমাদ: ২১৫৪)

রোজার উত্তম নিয়ম, অতএব, উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য সুন্নাত ও সঠিক নিয়ম হলো-মহররমের ৯ ও ১০ তারিখ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ, অর্থাৎ পরপর দুটি রোজা রাখা।

১০ই মহররমের রোজা কেবল একটি সাধারণ ঐতিহাসিক প্রথাই নয়, বরং এটি সমস্ত নবী-রাসূলদের পবিত্র সুন্নাত এবং আল্লাহর প্রতি পরম কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য মাধ্যম। আসুন, সমস্ত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের এই পবিত্র সুন্নাতকে ভালোবেসে এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও গুনাহ মাফের আশায় আমরাও আশুরার রোজা যথাযথভাবে পালন করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তৌফিক দান করুন। আমীন।

Comments (0...)

No comments yet

Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Your comment will be reviewed before being published.

Have an account? Sign in

Loading...

সর্বশেষ খবর

সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার

সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার

১৫ জুলাই, ২০২৬ - ভোর ৫:৩৪ মি.
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দিনভর শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ,সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দিনভর শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ,সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ

১৪ জুলাই, ২০২৬ - রাত ১১:৫৮ মি.
ফার্মের মুরগির ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আপনি এখন শিক্ষামন্ত্রী, হাসনাত আব্দুল্লাহ

ফার্মের মুরগির ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আপনি এখন শিক্ষামন্ত্রী, হাসনাত আব্দুল্লাহ

১৪ জুলাই, ২০২৬ - রাত ১১:৩২ মি.
১ বছরে ৪১ লাখ নারী পাবেন ফ্যামিলি কার্ড, গৌরনদীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

১ বছরে ৪১ লাখ নারী পাবেন ফ্যামিলি কার্ড, গৌরনদীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

১৪ জুলাই, ২০২৬ - সকাল ১০:১৫ মি.
মাদক কেনাবেচায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, সংসদে বিল পাস

মাদক কেনাবেচায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, সংসদে বিল পাস

১৪ জুলাই, ২০২৬ - রাত ১২:৪০ মি.
মডেল মসজিদ প্রকল্পে অনিয়ম,মসজিদভিত্তিক অনুসন্ধানের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

মডেল মসজিদ প্রকল্পে অনিয়ম,মসজিদভিত্তিক অনুসন্ধানের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

১৩ জুলাই, ২০২৬ - রাত ৮:৩৬ মি.
মাথায় ত্রাণের বস্তা নিয়ে চট্টগ্রামের বন্যাদুর্গত মানুষের দ্বারে দ্বারে যুবদল সভাপতি মুন্না

মাথায় ত্রাণের বস্তা নিয়ে চট্টগ্রামের বন্যাদুর্গত মানুষের দ্বারে দ্বারে যুবদল সভাপতি মুন্না

১২ জুলাই, ২০২৬ - বিকেল ৫:৫৮ মি.
টানা বর্ষণ ও পাহাড় ধসে নিহত বেড়ে ৪৪, বান্দরবান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, বিপাকে ১০ লাখ মানুষ

টানা বর্ষণ ও পাহাড় ধসে নিহত বেড়ে ৪৪, বান্দরবান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, বিপাকে ১০ লাখ মানুষ

১২ জুলাই, ২০২৬ - সকাল ১০:৩০ মি.
সাবেক স্পিকার ও বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই

সাবেক স্পিকার ও বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই

১২ জুলাই, ২০২৬ - সকাল ১০:২৪ মি.
১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উদ্যোগে শুরু হওয়া ইফার মউশিক প্রকল্প রাজস্বকরণের দাবি

১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উদ্যোগে শুরু হওয়া ইফার মউশিক প্রকল্প রাজস্বকরণের দাবি

১১ জুলাই, ২০২৬ - রাত ১১:৫৭ মি.

সর্বাধিক পঠিত

সৎ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, নারী সহকর্মীর নাম ব্যবহার করে ভুয়া অভিযোগ

৪৫৫ বার পড়া হয়েছে

ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিনদের সতর্ক করল ইসলামিক ফাউন্ডেশন

৪১১ বার পড়া হয়েছে

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নতুন মহাপরিচালক মহিবুল্লাহিল বাকী

৩৭৮ বার পড়া হয়েছে

গাড়ি বিক্রির আড়ালে বিশ্বাস ইম্পোর্টসের প্রতারণা, মালিকানা নিয়ে জালিয়াতি

৩২৫ বার পড়া হয়েছে

১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উদ্যোগে শুরু হওয়া ইফার মউশিক প্রকল্প রাজস্বকরণের দাবি

৩০০ বার পড়া হয়েছে

দৌলতদিয়ায় যাত্রীবাহী বাস পদ্মায়, ২ মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজদের সন্ধানে উত্তাল নদীতে তল্লাশি

২৯০ বার পড়া হয়েছে

আল্লাহ তাআলা আসমান ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন

২৮৫ বার পড়া হয়েছে

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন মুফতি মুহিব্বুল্লাহিল বাকী

২৮০ বার পড়া হয়েছে

আরাফাতের ময়দান, নবীদের অশ্রু, তাওবা ও দোয়ার পুণ্যভূমি

২৭৭ বার পড়া হয়েছে
১০

নবাবগঞ্জে ‘নবুয়ত’ দাবির প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন

২৭৬ বার পড়া হয়েছে