মুহাম্মদ আল আমিন (এমএ): মসজিদে নববীর পূর্ব পাশে অবস্থিত মদীনার ঐতিহাসিক গোরস্থান ‘জান্নাতুল বাকী’ (সাবেক বাকীউল গারকাদ)-যাকে বলা হয় সাহাবিদের শেষ ঠিকানা। পবিত্র এই ভূমিতে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আহলে বাইত, উম্মুল মুমিনীন ও তাবেঈনদের পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন প্রায় ১০ হাজার সাহাবায়ে কেরাম।
ঐতিহাসিক তথ্যমতে, প্রায় ১০ হাজার সাহাবায়ে কেরাম এই পবিত্র মাটিতে শায়িত আছেন। তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত কয়েকজন ব্যক্তিত্ব: খলীফা ও প্রখ্যাত সাহাবিগণ ইসলামের তৃতীয় খলীফা ও ‘জুন নূরাইন’ খ্যাত হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.), আশারায়ে মুবাশশারার অন্তর্ভুক্ত হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.), প্রখ্যাত সেনাপতি হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.), আওস গোত্রপ্রধান হযরত সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.)- যাঁর ইন্তেকালে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছিল বলে হাদিসে এসেছে; এছাড়া প্রসিদ্ধ হাদিস বর্ণনাকারী হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) এবং কোরআনের তাফসীরকার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)।
উম্মুল মুমিনীনগণ: হযরত খাদিজা (রা.) [মক্কার জান্নাতুল মুআল্লাহয় শায়িত] এবং হযরত মায়মুনা (রা.) [মক্কার উপকণ্ঠের সারিফ এলাকায় শায়িত]- এই দুজন ব্যতীত মহানবীর (সা.) বাকি সব স্ত্রী এখানেই শায়িত: হযরত আয়েশা সিদ্দীকা, হাফসা, উম্মে সালামা, জয়নব বিনতে খুজাইমা, জয়নব বিনতে জাহাশ, উম্মে হাবিবা, জুওয়াইরিয়া, সাফিয়া ও মারিয়া আল-কিবতিয়া (রা.)।
আহলে বাইত ও পরিবারবর্গ: নবীজির প্রিয়তম কন্যা ও জান্নাতী নারীদের সর্দার হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা (রা.), অন্য তিন কন্যা-রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও জয়নব (রা.), জান্নাতী যুবকদের সর্দার হযরত হাসান ইবনে আলী (রা.), নবীজির চাচা হযরত আব্বাস (রা.), শিশুপুত্র হযরত ইব্রাহিম (রা.), চাচাতো ভাই হযরত আকীল (রা.) এবং ফুফু হযরত সাফিয়া বিনতে আব্দুল মুত্তালিব (রা.)।
অন্যান্য প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব: নবীজির দুধমা হযরত হালিমা সাদিয়া (রা.) এবং পরবর্তী যুগের মদীনার ইমাম, ‘আল-মুওয়াত্তা’র সংকলক ইমাম মালিক (রহ.)।
জান্নাতুল বাকীর অনন্য মর্যাদা সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.)-এর ক্ষমা প্রার্থনা: হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, এক রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিঃশব্দে ঘর থেকে বের হয়ে জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে দোয়া করেন। পরে জানান, জিবরাইল (আ.) এসে তাঁকে বাকীবাসীদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছিলেন (সহীহ মুসলিম: ৯৭৩)।
কবর জিয়ারতের সুন্নাহ, কবর জিয়ারতে গিয়ে রাসূল (সা.) বলতেন-হে মুমিন ও মুসলিম কবরবাসীগণ! আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ চাইলে আমরাও আপনাদের সঙ্গে মিলিত হব। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের ও আপনাদের জন্য ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি (সহীহ মুসলিম: ৯৭৪)।
বিনা হিসাবে জান্নাত লাভ, হযরত উম্মে কায়েস বিনতে মুহসিন (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন বাকীউল গারকাদ থেকে ৭০ হাজার মানুষ পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল চেহারা নিয়ে উঠবে এবং বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে (মুসতাদরাকে হাকিম: ৭০৩৫)।
কোরআনে সরাসরি জান্নাতুল বাকীর নাম না থাকলেও মৃত্যু ও আখিরাতের বাস্তবতা তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা বলেন, প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে, (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)।
জান্নাতুল বাকী আমাদের শিক্ষা দেয়-মর্যাদা, সম্পদ কিংবা ক্ষমতা নয়; মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার ঈমান ও নেক আমল। কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্য কোনো কবরবাসীর কাছে কিছু চাওয়া নয়—তা ইসলামি আকিদার পরিপন্থী, বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের আখিরাত স্মরণ করা এবং মৃতদের জন্য দোয়া করা।
বর্তমানে জান্নাতুল বাকী উঁচু প্রাচীরবেষ্টিত। ফজর ও আসরের সালাতের পর নির্দিষ্ট সময়ে সীমিত পরিসরে দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। কোনো ধরনের শিরক বা বিদআতি আচরণ যেন না ঘটে, সেজন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সেখানে কড়া নজরদারি রাখা হয়।
জান্নাতুল বাকি কেবল একটি কবরস্থান নয়- এটি ইসলামের ইতিহাস, সাহাবিদের ত্যাগ ও আখিরাতের স্মৃতিবাহী এক পবিত্র ভূমি। আল্লাহ তাআলা আমাদের কবরের জীবন সহজ করুন, নেক আমলের তাওফিক দান করুন এবং সকল মৃত মুসলিমকে ক্ষমা করুন। আমিন।