পীরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিনিধি: রংপুর নগরে অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুলশিক্ষক, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক আর অনিশ্চয়তার স্তব্ধতা। নিহতের স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে মাছুয়াপাড়ার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে তাঁদের এক কথা, একটি পুরো পরিবার নিমিষেই শেষ হয়ে গেল, বাড়িতে বাতি জ্বালানোর মতোও কেউ আর রইল না।
পুলিশের দাবি, ছাদে বসে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়া এবং চিনে ফেলার আশঙ্কায় প্রতিবেশী দুই তরুণ একে একে পরিবারটির চার সদস্যকে হত্যা করেছে। তবে নিহতদের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা এই ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারছেন না। তাঁদের প্রশ্ন মাত্র দুজন অল্প বয়সী তরুণ কীভাবে কোনো প্রতিরোধ ছাড়া একটি পরিবারের চারজনকে এভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিল?
গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কামালকাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি নির্মাণাধীন তিনতলা ভবন থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস।
নিহতরা হলেন: গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫): রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক (হিসাববিজ্ঞান)। প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০): গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী। আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫): স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী। আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২): রংপুর জিলা স্কুলের ৫ম শ্রেণির ছাত্র।
শনিবার রাতে দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করেও পরিবারের কারও ফোন চালু না পেয়ে বোন প্রীতিলতার বাড়িতে যান পূজা চক্রবর্তী। মূল ফটক ও পুরো ঘর অন্ধকার দেখে প্রতিবেশীদের সহায়তায় প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢোকেন তিনি।
ভয়ানক সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে পূজা চক্রবর্তী বলেন, ভেতরে ঢুকে দেখি খাটের নিচে পড়ে আছে ছোট ভাগনে আয়ুশের লাশ, সিঁড়িতে বোন ও ভাগনির মরদেহ, আর তিনতলার ছাদে পড়ে আছেন জামাইবাবু। উনি খুব শান্ত মানুষ ছিলেন, অনেক কষ্ট করে বাড়িটা করেছিলেন। এই পরিবারের তো বাতি জ্বালানোরও কেউ আর বেঁচে রইল না। আমরা এই নৃশংসতার কঠিন শাস্তি চাই।
ঘটনার পরদিন ভোরে জড়িত সন্দেহে সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামে প্রতিবেশী দুই তরুণকে আটক করে পুলিশ। রোববার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার বা শুক্রবারের কোনো একসময়ে ভবনটির ছাদে বসে মাদক সেবন করছিলেন ওই দুই তরুণ।
শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী দেখে ফেলে বাধা দিলে তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে চিৎকার শুনে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে এগিয়ে এলে তাঁদেরও হত্যা করা হয় এবং শেষে ঘরে ঘুমিয়ে থাকা শিশু আয়ুসকে মেরে ফেলা হয়।
হত্যার পর ঘাতকেরা ওই বাড়িতেই কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে গোসল সারে, ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে খায় এবং পুনরায় মাদক সেবন করে। পরে ডাকাতির নাটক সাজাতে ঘরের জিনিসপত্র অগোছালো করে রেখে সেখান থেকে সটে পড়ে।
পুলিশের এই মাদক সেবনে বাধা ও ডাকাতির সাজানো গল্পের ব্যাখ্যা মানতে নারাজ নিহতের স্বজনেরা। তাঁদের মতে, কম বয়সী দুজন তরুণের শারীরিক সামর্থ্য দিয়ে চারজন মানুষকে এভাবে হত্যা করা বাস্তবসম্মত নয়। এ ঘটনায় নিহত গণপতির ভাই বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন।
ফুঁসে উঠেছে রংপুর, ক্ষোভ ও বিচারের দাবি, একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো রংপুর। ঘটনার প্রতিবাদ ও দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে রংপুর জিলা স্কুল ও কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ।
নিজের বসতঘরেও মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কেন থাকবে না এমন প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। নিছক মাদক সেবনের প্রতিবাদই কি এই নির্মমতার কারণ, নাকি পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গভীর শত্রুতা বা রহস্য, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসবে বলে দাবি ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর।