সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি: নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনা নদী যেন পরিণত হয়েছে আতঙ্কের আরেক নামে। কয়েক দিনের ব্যবধানে পৃথক দুটি দুর্ঘটনায় নদীতে প্রাণ হারিয়েছেন চারজন, নিখোঁজ রয়েছেন আরও চারজন। একদিকে আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়া ট্রলার ডুবে একই পরিবারের চারজনের নিখোঁজ হওয়া, অন্যদিকে নদীতে গোসলে নেমে জমজ দুই ভাইসহ তিন স্কুলশিক্ষার্থীর মৃত্যু—এই দুই ঘটনায় শোকস্তব্ধ পুরো মেঘনাপাড়।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সোনারগাঁও উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের সোনামই এলাকায় আমান সিমেন্ট কারখানা-সংলগ্ন মেঘনা নদীতে ১৪ জন যাত্রী নিয়ে একটি ট্রলার ডুবে যায়। কুমিল্লার হোমনা এলাকা থেকে যাত্রীরা সোনারগাঁওয়ের হারিয়া এলাকায় সাজিয়া আক্তার ও শিশির দম্পতির বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। নদী পার হওয়ার সময় হঠাৎ ট্রলারটি ডুবে গেলে যাত্রীরা পানিতে ছিটকে পড়েন।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা অন্য একটি ট্রলার নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং কয়েকজনকে উদ্ধার করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর রায়েশা বেগম (৫৫) নামের এক নারীকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান দিগন্ত।
দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চারজন এখনো নিখোঁজ। তাঁরা হলেন হেলাল উদ্দিন (৫৫), তাঁর দুই ছেলে সজীব (২৪) ও সামিন (৫), এবং মেয়ে সামিয়া (১৭)। তবে হেলাল উদ্দিনের স্ত্রী শিরিন বেগম (৪৫) ও অপর মেয়ে লামিয়া আক্তারকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
সোনারগাঁও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মোহাম্মদ জাহেদ চৌধুরী বলেন, দুপুর দেড়টার দিকে দুর্ঘটনা ঘটলেও তাঁরা খবর পান বিকেল পৌনে পাঁচটায়। খবর পাওয়ামাত্র উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিখোঁজদের সন্ধানে মেঘনায় অভিযান শুরু করে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
ট্রলারডুবির কিছুদিন আগেই একই নদী কেড়ে নেয় আরও তিনটি প্রাণ। সোনারগাঁও উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের ভাটিবন্দর এলাকায় মেঘনায় গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হওয়া তিন স্কুলশিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস।
নিহতরা হলো মোগরাপাড়া ইউনিয়নের বাড়ি মজলিস এলাকার মো. ফারুকের জমজ দুই ছেলে আরিফিন (১৫) ও আশিকিন (১৫), এবং একই এলাকার আব্দুল আলীমের ছেলে আবির (১৪)। জমজ দুই ভাই স্থানীয় মোগরাপাড়া এইচ জি জি এস স্মৃতি সরকারি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এবং আবির একই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় চার সহপাঠী। পরে তারা মেঘনার ভাটিবন্দর এলাকায় জড়ো হয়ে একসঙ্গে গোসলে নামে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তীব্র স্রোতের কবলে পড়ে তিনজন পানির নিচে তলিয়ে যায়। চতুর্থ বন্ধু আদিয়ান ফারিজ কোনোমতে সাঁতরে তীরে উঠে প্রাণে বাঁচে। তার চিৎকার শুনে ছুটে আসেন স্থানীয়রা, যাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে খবর দেন ফায়ার সার্ভিস ও নৌপুলিশকে।
খবর পেয়ে নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি ডুবুরি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দীর্ঘ তল্লাশি চালায়। বিকেল নাগাদ তিন শিক্ষার্থীরই মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল আরেফিন বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই তাঁদের ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালিয়ে তিন শিক্ষার্থীর মরদেহই উদ্ধার করে।
অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এই দুই দুর্ঘটনায় সোনারগাঁওজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। একদিকে জমজ দুই ভাইসহ তিন কিশোরের অকালমৃত্যু, অন্যদিকে নিখোঁজ চার স্বজনের ফেরার অপেক্ষায় মেঘনার তীরে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, মেঘনার তীব্র স্রোত এবং নৌযানে ধারণক্ষমতার তুলনায় বাড়তি যাত্রী পরিবহনের প্রবণতাই বারবার এ ধরনের প্রাণহানির অন্যতম কারণ। তাঁরা নদীপথে চলাচলে বাড়তি সতর্কতা এবং শিশু-কিশোরদের নদীতে গোসলের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের কঠোর তদারকি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন।
সোনারগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, উভয় ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজদের সন্ধানে মেঘনা নদীতে উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে।