নিজেস্ব প্রতিবেদক: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়কার হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ১২টি মামলায় দীর্ঘ ৩৯১ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেত্রী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী।গতকাল বুধবার (৩ জুন) রাত ১০টা ৮ মিনিটের দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। এরপর রাত সাড়ে ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগে তাঁর নিজ বাসভবন ‘চুনকা কুটিরে’ এসে পৌঁছান। দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় পর আইভী বাসায় ফেরায় তাঁর স্বজন ও অনুসারীদের মাঝে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সাবেক মেয়র আইভী সরাসরি চলে যান নারায়ণগঞ্জ নগরীর মাসদাইরে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সিটি কবরস্থানে। সেখানে তিনি তাঁর বাবা (নারায়ণগঞ্জের কিংবদন্তি নেতা আলী আহাম্মদ চুনকা), মা ও ছোট ভাইয়ের কবর জিয়ারত করেন। এরপর মধ্যরাতে দেওভোগের বাসায় পৌঁছালে শত শত কর্মী-সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ী তাঁকে স্বাগত জানান। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাঈদ মাসুদসহ স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে চুনকা কুটিরের সামনে এবং শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা যায়।
বাসায় পৌঁছানোর পর উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। দেশের বিচার বিভাগ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি বিচার বিভাগের প্রতি অসম্ভব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এবং সরকারের প্রতিও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আমি চাই, সকলকে নিয়ে একটি মানবিক সরকার গঠিত হোক।
কারাগারে থাকা অন্য নারীদের কথা উল্লেখ করে তিনবারের এই সফল মেয়র আরও বলেন, “জেলে আমার মতো আরও অনেক মায়েরা আছেন, যাঁরা নিরপরাধ। আশা করছি, সরকার তাঁদের প্রতিও সদয় হবে।
২০২৫ সালের মে মাসে নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে আইভীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ের ৩টি হত্যা মামলা ও ২টি হত্যাচেষ্টা মামলাসহ মোট ১২টি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আইভীর আইনজীবী আওলাদ হোসেন জানান, মামলাগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। তিনি বলেন, “আমরা আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ আদালত থেকে ন্যায়বিচার পেয়েছি। হাইকোর্ট তাঁকে জামিন দেওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষ তা বাতিলের জন্য আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে গিয়েছিল। তবে আপিল বিভাগ শুনানি শেষে হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের আদেশই বহাল রাখায় তাঁর মুক্তিতে আর কোনো বাধা থাকেনি।
কারা অধিদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ সাবেক মেয়র আইভীর জামিনের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বুধবার ১২টি মামলায় আইভীর জামিনের কাগজপত্র কারাগারে পৌঁছায়। তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কোনো আটকাদেশ না থাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে রাতে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান ও মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়েও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আরেক প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমানকে ১ লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দেশের প্রথম নারী সিটি মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর টানা তিন মেয়াদে তিনি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন এবং নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে সবসময়ই সন্ত্রাস ও গডফাদার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।