নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ইঞ্জিনচালিত রাবারের নৌকা বিকল হয়ে অন্তত ২২ জন অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে বড় একটি অংশ বাংলাদেশি বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গ্রিসের উপকূলীয় রক্ষা বাহিনী (কোস্টগার্ড) গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) গভীর রাতে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে, যাদের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি নাগরিক।
উদ্ধারকৃতদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, গত ২১ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে একটি রাবারের নৌকায় করে তারা ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাত্রার কিছু সময় পর নৌকাটি দিক হারিয়ে ফেলে এবং মাঝসমুদ্রে ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। টানা ৬ দিন কোনো খাবার ও পানীয় ছাড়া তীব্র শীত আর প্রতিকূল আবহাওয়ায় সমুদ্রে ভাসতে থাকেন তারা। অনাহার, পানিশূন্যতা এবং তীব্র ঠান্ডায় একে একে ২২ জন যাত্রী মারা যান। বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, মানবপাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত ও উপকূলীয় রক্ষা বাহিনী ফ্রন্টেক্সের একটি জাহাজ গ্রিসের বৃহত্তম দ্বীপ ক্রিটের কাছ থেকে ২৬ জনকে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি, ৪ জন দক্ষিণ সুদানি এবং ১ জন চাদের নাগরিক রয়েছেন। এদের মধ্যে একজন নারী ও একটি শিশুও রয়েছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দুজনকে ক্রিটের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে, এই ট্র্যাজেডিতে সুনামগঞ্জের দিরাই ও জগন্নাথপুর উপজেলার অন্তত ৮ থেকে ১০ জন যুবকের মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছালে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতদের স্বজনরা জানান, একেকজন যুবককে ইতালি পাঠানোর জন্য দালালের হাতে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন তারা। বসতভিটা ও হালের গরু বিক্রি করে দেওয়া এই টাকা এখন কেবল শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের এক নিহতের মামা উমেদ আলী বিলাপ করতে করতে বলেন, জমি বিক্রি করে দালালের হাতে টাকা তুলে দিয়েছিলাম ছেলেকে পাঠাতে। এখন টাকাও গেল, ছেলেও গেল। আমরা এই খুনি দালাল চক্রের বিচার চাই।
গ্রিক কর্তৃপক্ষ এই ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে দক্ষিণ সুদানের দুই যুবককে (১৯ ও ২২ বছর) গ্রেপ্তার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশে সহায়তা এবং অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়েছে। এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসেই অন্তত ৫৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৮৭ জন।