বিশেষ প্রতিনিধি: বিএনপির চরম সংকটকালে দলকে সুসংগঠিত রাখা ও অটল নেতৃত্বে ধরে রাখা জ্যেষ্ঠ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির আসনে বসতে যাচ্ছেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বিএনপি তাদের কান্ডারিকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। রাজনৈতিক কোনো বড় অঘটন না ঘটলে, আগামী ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ভোটে তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গেল ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর পদটি শূন্য হয়।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক ও কর্মজীবন বর্ণাঢ্য। ঠাকুরগাঁওয়ের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
ছাত্রজীবনে ১৯৬০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়ে বামপন্থি রাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ও বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের নেতৃত্বে ছিলেন এবং কারাবরণও করেন।
শিক্ষা ক্যাডারের অধীনে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে ১৯৭২ সালে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে পরিদর্শ ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে দায়িত্ব সামলান। ১৯৭৯ সালে উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর পিএস হিসেবে যোগ দেওয়ার পর ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে নামেন।
১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৯০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। কৃষক দলের দীর্ঘদিনের দায়িত্ব পালনের পর ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব পদে নির্বাচিত হন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে মামলা, নির্যাতন ও তিন দফা কারাবাসের মুখোমুখি হয়েও তিনি বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনকে ধরে রাখেন। বিশেষ করে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে রাজপথ ও দলের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কৃষি এবং বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ফখরুল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে ভোটে অনিয়মের প্রতিবাদে তিনি শপথ নেননি।
সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গঠিত তারেক রহমানের নতুন সরকারে তিনি ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন।
দল-মত নির্বিশেষে একজন ভদ্র ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে সর্বমহলে মির্জা ফখরুলের বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে রাষ্ট্রপতির মতো মর্যাদাপূর্ণ পদে মনোনয়ন দেওয়াকে বিএনপি নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, দুই মেয়ে শামারুহ মির্জা ও সাফারুহ মির্জাকে নিয়ে তার পরিবার। বর্ণাঢ্য কর্মজীবন, শিক্ষকতা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর এবার বঙ্গভবনের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার দোরগোড়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।