রবিউল আউয়াল প্রিয় নবীজির আগমন ও বিদায়ের অবিস্মরণীয় মাস

রবিউল আউয়াল প্রিয় নবীজির আগমন ও বিদায়ের অবিস্মরণীয় মাস

মুহাম্মদ আল আমিন (এমএ) : আরবি রবিউল আউয়াল শব্দের অর্থ প্রথম বসন্ত। রবি অর্থ বসন্ত, আউয়াল অর্থ প্রথম অর্থাৎ আরবের বসন্তকালের প্রথম মাস (লিসানুল আরব)। ইসলামি হিজরি চান্দ্রবর্ষের তৃতীয় মাস এটি। প্রকৃতিতে বসন্তকাল যেমন ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে নবজাগরণের বার্তা বয়ে আনে, তেমনি বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়েও এই মাসের আবেদন নিছক কোনো ঋতু পরিবর্তনের গল্প নয় এ যেন সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে আলোকিত অধ্যায়ের সূচনা ও সমাপ্তির সাক্ষী এক পবিত্র সময়।

আল্লাহ তাআলা পথহারা মানবকুলকে হেদায়েতের দিশা দিতে যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন, তারই ধারাবাহিকতায় সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রসুল হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই ধরণীতে প্রেরণ করেন। ইতিহাসের এক বিস্ময়কর বিচারে, প্রিয় নবীজি (সা.)-এর পবিত্র আগমন, মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত এবং এই ধরা থেকে তাঁর মহাপ্রস্থান এই তিনটি মহান ঘটনাই ঘটেছে রবিউল আউয়াল মাসে (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)। ফলে এই মাসটি এলেই কোটি কোটি মুমিনের হৃদয়ে একসঙ্গে দোলা দেয় বিপরীতমুখী দুই অনুভূতি একদিকে আল্লাহর প্রিয় হাবিবকে পাওয়ার অনাবিল আনন্দ, অন্যদিকে তাঁর বিদায়ের নীরব ও গভীর বিষাদ।

ইসলামি ক্যালেন্ডারের তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। রবি  শব্দটি এসেছে ইরতিবাউন থেকে, যার অর্থ ঘরে অবস্থান করা প্রাচীন আরবে এই সময় মানুষ ঘরে বসে থাকত বলে অনেকে মনে করেন এমন নামকরণের কারণ। আবার কারও মতে, রবি অর্থ বসন্তকালও বোঝায়, যেহেতু এই সময় আরব উপদ্বীপে বসন্তের ছোঁয়া লাগত। যেহেতু আরবের বসন্তকাল দুই মাস জুড়ে বিস্তৃত ছিল, তাই প্রথম মাসকে রবিউল আউয়াল ও পরবর্তী মাসকে রবিউল আখির নামে অভিহিত করা হয়েছে।

প্রসিদ্ধ অভিমত অনুযায়ী, ৫৭০ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক রবিউল আউয়াল মাসের এক মোবারক সোমবারে পৃথিবীর বুকে জন্মগ্রহণ করেন সৃষ্টিজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। আগের সব আসমানি কিতাবে তাঁর আগমনের প্রতিশ্রুতি ছিল, যুগে যুগে আল্লাহর বান্দারা প্রতীক্ষায় ছিলেন সেই মহান মুক্তিদাতার আর তাই এই দিনটি চিরকাল উম্মাহর কাছে সবচেয়ে আগ্রহ ও আনন্দের মুহূর্ত হয়ে থাকবে।

সিরাতগ্রন্থে বর্ণিত আছে, জন্মের পরপরই নবজাতক মুহাম্মদ (সা.) সেজদায় লুটিয়ে পড়েন, তারপর সেজদা থেকে মাথা তুলে ডান হাতের তর্জনী আকাশের দিকে ইঙ্গিত করেন যেন সদ্যোজাত শিশুটিও নিজের সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। সেই মুহূর্তে গোটা জন্মকক্ষ অপার্থিব আলোয় ভরে ওঠে। তাঁর মা হজরত আমেনা এই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, আমি ওই আলোতে ইরান, সিরিয়া ও হীরার রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত দেখতে পেলাম (তাফসিরে ইবনে কাসির)। যেন সেই আলোই ইঙ্গিত দিচ্ছিল, এই সদ্যোজাত শিশুর আগমনে গোটা পৃথিবীর ভাগ্য বদলে যাবে।

মা আমেনার সেবিকা শিফা বিনতে আসওয়াদ (রা.) আরও কিছু বিস্ময়কর ঘটনার সাক্ষী। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সদ্যভূমিষ্ঠ সাধারণ শিশুর মতো তাঁর শরীরে কোনো ময়লা-আবর্জনা ছিল না; নাভিকর্তিত ও খৎনাকৃত অবস্থাতেই তিনি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। এ সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) নিজেই বলেছেন, মহান আল্লাহ আমার প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করেছেন তার অন্যতম হলো, আমি খৎনাবিশিষ্ট হয়ে ভূমিষ্ঠ হয়েছি, যাতে আমার লজ্জাস্থান কেউ না দেখে (মুজামুল আওসাত, হাদিস: ৬১৪৮)।

জাহেলি যুগের ঘোর অন্ধকারে যখন মানুষ মূর্তিপূজা, রক্তপাত ও নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত, তখন এই শিশুই একদিন তাঁর অসাধারণ সততা, বিশ্বস্ততা, ধৈর্য ও উদারতা দিয়ে বর্বর আরব জাতির অন্তর জয় করে নেবেন, অর্জন করবেন "আল-আমিন" বা বিশ্বস্ত উপাধি। নবুওয়াতের মাত্র ২৩ বছরের স্বল্প সময়ে ক্ষুধা-অনাহারে জর্জরিত, বর্বরতায় নিমজ্জিত একটি জাতিকে তিনি রূপান্তর করবেন সুখ-সমৃদ্ধি ও গৌরবের এক সভ্য জাতিতে। স্বামী হিসেবে প্রেমময়, পিতা হিসেবে স্নেহশীল, ব্যবসায়ী হিসেবে বিশ্বস্ত, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ন্যায়পরায়ণ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি হয়ে উঠবেন অনুকরণীয় আদর্শ। কোরআনে তাঁর চরিত্রের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, মুমিনদের জন্য রাসুলের মধ্যেই রয়েছে অনুসরণযোগ্য সর্বোত্তম আদর্শ (সুরা আহজাব, আয়াত: ২১), আর অন্যত্র আল্লাহ ঘোষণা দেন যে তিনি সুমহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত (সুরা কলম, আয়াত: ৪)।

হিজরি একাদশ সন, রবিউল আউয়াল মাসের সেই একই মোবারক সোমবার-কিন্তু এবার দিনটি জন্মের মতো আনন্দের নয়, বরং উম্মতের ইতিহাসে সবচেয়ে দুঃখ ও বেদনার। এই দিনই মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই পৃথিবী ত্যাগ করেন এবং রফীকে আলা তথা আল্লাহর সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। মদিনার আকাশ-বাতাস সেদিন যেন থমকে গিয়েছিল; সাহাবিদের হৃদয় ভেঙে পড়েছিল এমন এক শোকে, যার তুলনা ইতিহাসে বিরল।

জীবনের শেষ প্রান্তে সাহাবিদের একত্র করে নবীজি (সা.) সবার জন্য দোয়া করেন এবং উপদেশ দেন তাকওয়া অর্জনের, অহংকার থেকে বিরত থাকার। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইহুদি-খ্রিষ্টানরা তাদের নবীদের কবরকে সিজদার স্থান বানিয়েছিল বলে তাদের প্রতি আল্লাহর অসন্তুষ্টি নেমে এসেছিল যেন উম্মত তাঁর কবরকেও এমন স্থানে পরিণত না করে (সহিহ বুখারি)। ইন্তেকালের কিছুক্ষণ আগে তিনি শেষবারের মতো উপদেশ দেন নামাজের প্রতি যত্নশীল হও, অধীনস্থদের সঙ্গে দয়া ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করো (আবু দাউদ)। আর ইন্তেকাল-পূর্ববর্তী সবশেষ গণজমায়েতে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন বিদায় হজের ভাষণ আজও তা মানবজাতির ইতিহাসে সর্বোৎকৃষ্ট উপদেশ হিসেবে স্বীকৃত।

পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, প্রায় দেড় হাজার বছর পরও যাঁকে কোটি কোটি মানুষ সমানভাবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করে চলেছে, আর কেয়ামত পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে। জন্মের আনন্দ আর বিদায়ের বেদনা এই দুই যেন একই সুতোয় গাঁথা, উম্মতকে প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় সেই ভালোবাসার গভীরতা, যা কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ থাকার নয়।

মহানবী (সা.)-এর ধরণীতে আগমন ও বিদায় উভয়টিই যে রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার দিনে সংঘটিত হয়েছিল, এ বিষয়ে ঐতিহাসিক ও সিরাতবিদদের মধ্যে সর্বসম্মত মত রয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে আলেম ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত রয়েছে:

জন্মের তারিখ সংক্রান্ত মতভেদ: ইবনে ইসহাকের মতে রাসুল (সা.) ১২ রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেন। আধুনিক সিরাতগ্রন্থ আর-রাহীকুল মাখতূম ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সূক্ষ্ম গণনার আলোকে ৯ রবিউল আউয়াল তারিখটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২, ৮, ১০ ও ১৭ রবিউল আউয়ালের বর্ণনাও কিতাবাদিতে বিদ্যমান।
ওফাতের তারিখ: ইন্তেকালের তারিখ নিয়ে সিরাতবিদদের খুব বেশি মতপার্থক্য নেই; অধিকাংশের মতেই হিজরি ১১ সনের ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার তিনি ইন্তেকাল করেন।

জন্ম ও ওফাত-উভয়ই যে রবিউল আউয়াল মাসের কোনো এক সোমবারে হয়েছে, এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ইতিহাসবিদ ও উলামায়ে কেরাম একমত।

রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাত দিবসটি মুসলিম সমাজে ফাতেহায়ে দোয়াজদাহুম নামে পরিচিত। ফারসি এই শব্দবন্ধে দোয়াজদাহুম মানে ১২, অর্থাৎ পুরো কথাটির অর্থ দাঁড়ায় ১২ তারিখের ফাতিহা অনুষ্ঠান।

কালক্রমে এই দিনটি মিলাদুন্নবী (সা.) নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে, যার অর্থ নবী (সা.)-এর জন্ম অনুষ্ঠান। ধীরে ধীরে এর সঙ্গে ঈদ শব্দ যুক্ত হয়ে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) রূপ লাভ করে। এ পর্যায়ে আরেকটি পরিভাষাও প্রচলিত হয় সিরাতুন্নবী (সা.) , অর্থাৎ নবী (সা.)-এর জীবনচরিত বা জীবনী আলোচনা অনুষ্ঠান। এ দিবসে অনেকে জশনে জুলুশ বা শোভাযাত্রা ও আনন্দ র‍্যালিও করে থাকেন।

মিলাদ শব্দের আভিধানিক অর্থ জন্মলগ্ন, জন্মক্ষণ বা জন্ম সম্পর্কে আলোচনা। প্রচলিত পরিভাষায় মিলাদ বলতে বোঝায় প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও জীবনী আলোচনা এবং তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করা। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে—

নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল (সা.)-এর প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, ফেরেশতাগণ তাঁর জন্য দোয়া করেন; হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ ও যথাযথরূপে সালাম পেশ করো। (সুরা আহজাব, আয়াত: ৫৬)

সাহাবিরা নিজেদের প্রাণের চেয়েও নবীজি (সা.)-কে বেশি ভালোবাসতেন। তাঁর নির্দেশে তাঁরা পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন ও বাড়িঘর ছেড়ে হাবশা ও মদিনায় হিজরত করেছেন। উহুদ যুদ্ধে শত্রুর নিক্ষিপ্ত তীর থেকে নবীজিকে রক্ষা করতে কয়েকজন সাহাবি নিজেদের শরীরকে ঢাল বানিয়েছিলেন।

এই ভালোবাসার গভীরতা বোঝাতে হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, একবার এক ব্যক্তি নবীজিকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানতে চান লোকটি কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছেন। লোকটি জবাব দেন যে বিশেষ কোনো আমল নেই, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে তিনি ভালোবাসেন। তখন নবীজি তাকে সুসংবাদ দেন যে সে তার ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গেই থাকবে (সহিহ বুখারি: ৩৬৮৮)।

আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পথ অনুসরণ করা অপরিহার্য তিনি যা করতে বলেছেন তা করা, আর যা করতে বারণ করেছেন তা বর্জন করা।

কোরআনে এসেছে-রাসুল তোমাদের যা দেন, তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা থেকে তোমাদের নিষিদ্ধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকো। (সুরা হাশর, আয়াত: ৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা ইমানের পূর্বশর্ত, আর সেই ভালোবাসা প্রকাশ পায় তাঁর নির্দেশ পালন ও অনুকরণের মধ্য দিয়ে।

কোরআন মাজিদে বলা হয়েছে-(হে রাসুল!) বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমার অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।" (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)

নবীজি নিজেই ভালোবাসার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-পুত্র ও যাবতীয় সবকিছুর চেয়ে প্রিয় হব (সহিহ বুখারি: ১৩-১৫)। আর প্রকৃত ভালোবাসার প্রমাণ হলো তাঁর সুন্নত অনুসরণ করা। তিনি বলেছেন, যে তাঁর সুন্নতকে জীবিত রাখল, সে যেন তাঁকেই ভালোবাসল (তিরমিজি: ২৬৭৮)।

একই মাসে জন্ম ও মৃত্যুর এই ঐশী সংযোগ মুমিনকে অতি-উল্লাস কিংবা অতি-শোকের ঊর্ধ্বে উঠে ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়। ইসলাম আনুষ্ঠানিক উৎসবের মাধ্যমে জন্মদিন পালন কিংবা বিলাপের মাধ্যমে বার্ষিক মৃত্যুদিবস পালনের অনুমোদন দেয় না। শোক প্রকাশের ইসলামি নিয়ম অনুযায়ী কারও ইন্তেকালে দুঃখ প্রকাশ স্বাভাবিক, তবে তা তিন দিনের বেশি দীর্ঘায়িত করার বিধান নেই (স্ত্রীর জন্য স্বামীর মৃত্যুর ক্ষেত্র ব্যতীত)। মৃত্যুবার্ষিকী বা চল্লিশা পালনেরও কোনো ইসলামি ভিত্তি নেই।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, নবীজি নিজে তাঁর জন্মের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ প্রতি সোমবার রোজা রাখতেন এটিই ছিল তাঁর নিজের জন্মদিন স্মরণের পদ্ধতি, কোনো আনুষ্ঠানিক উৎসব বা সমাবেশ নয়। অথচ ঈদের দিনগুলোতে রোজা রাখা হারাম। আনসারি সাহাবি হজরত আবু কাতাদাহ (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন যে এই দিনেই তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এবং এই দিনেই নবুওয়াত লাভ করেছেন (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)। এখানে লক্ষণীয়, তিনি নির্দিষ্ট তারিখ নয়, বরং জন্মবার (সোমবার) স্মরণ করতেন।

আমাদের সমাজের একশ্রেণির মানুষ ১২ রবিউল আওয়ালের দিনটিকে সাইয়্যেদুল আইয়াদ তথা সকল ঈদের বড় ঈদ বলে দাবি করেন। অথচ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জুমহুর তথা অধিকাংশ আলেম এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অভিমত হলো, মিলাদুন্নবি উপলক্ষে ইসলামে কোনো ঈদ নেই। ইসলামে নির্ধারিত ঈদ কেবল দুটি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এক হাদিসে নবীজি বলেন, প্রত্যেক জাতির উৎসব আছে, আমাদের উৎসব হলো এই দুই ঈদ (মুসলিম, তিরমিজি)।

মরহুম ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, ইসলামের প্রথম ছয়শ বছরে ঈদে মিলাদুন্নবির অস্তিত্বই ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, প্রসিদ্ধ চার ইমাম, বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানি, ইমাম গাজ্জালিসহ কেউই ঈদে মিলাদুন্নবি পালন করেননি; তাঁরা সারা বছর রাসুলের সিরাত তথা জীবনী নিয়ে আলোচনা করতেন। আমাদেরও তা-ই করা উচিত এবং রাসুলের অনুসরণে সোমবার রোজা রাখা উত্তম।

এ বিষয়ে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের ৩৭০০২ নং ফতোয়ায় বলা হয়েছে, নবী কারিম (সা.) থেকে শুরু করে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, ইমামগণ ও বুজুর্গানে দিন এঁদের কারও থেকেই প্রচলিত জন্মদিন পালনের কোনো স্বীকৃতি পাওয়া যায় না; বরং এ পদ্ধতি বিজাতীয় প্রথা থেকে এসেছে বলে তাঁরা মনে করেন।

মিলাদুন্নবি সম্পর্কে মৌরিতানিয়ার বিশিষ্ট আলেম শায়খ মুহাম্মাদ ওয়ালিদুদ দাদো শানকিতি একটি ভারসাম্যপূর্ণ মত দিয়েছেন। যেহেতু রবিউল আউয়ালে রাসুল (সা.)-এর জন্ম ও মৃত্যু দুটোই হয়েছে, তাই তিনি বলেছেন-কেউ যদি বিশ্বাস করে রাসুলের জন্মদিনই ঈদ, সে বিদআত করল; আবার কেউ যদি তাঁর মৃত্যুদিনে আনন্দিত হয়, সে অন্যায় করল। তবে জন্মদিন উপলক্ষে কেউ যদি এমন কৃতজ্ঞতাসূচক আনন্দ প্রকাশ করে, যেমনটা ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুসা (আ.)-এর মুক্তির দিনে প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতে কোনো সমস্যা নেই-বরং তা আল্লাহর রাসুলের প্রতি সম্মান জানানোরই নামান্তর।

জন্ম ও ওফাতের এই একত্র সমাপতন আমাদের শেখায়-ইসলামে অতি-উল্লাস কিংবা অতি-শোকের কোনো স্থান নেই, বরং প্রয়োজন সুষম ও সংযত অনুভূতির। নবীজির প্রতি ভালোবাসা কোনো নির্দিষ্ট দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রতিদিন দরুদ পাঠ এবং তাঁর দেখানো আদর্শ জীবনে বাস্তবায়ন করাই হলো প্রকৃত ভালোবাসা। কবি নজরুল ইসলামের ভাষায় প্রকাশিত সেই সতর্কবার্তা আজও প্রাসঙ্গিক-রবিউল আউয়াল এলে যেন কেবল সাময়িক আবেগে গান গেয়ে মাস পেরোলেই তাঁকে ভুলে না যাই।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সুরা আহজাব, আয়াত: ২১)

রবিউল আউয়াল মাস কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এই মাস আমাদের অঙ্গীকার করার তাগিদ দেয়-আমরা যেন রাসুল (সা.)-এর আনীত আকাইদ, ইবাদত, আখলাক ও লেনদেনের আদর্শকে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করি এবং তাঁর পবিত্র সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করি।

রবিউল আউয়াল তাই কেবল ক্যালেন্ডারের একটি পাতা নয়; বরং এটি আনন্দ ও বেদনার এক মোহনায় দাঁড়িয়ে উম্মতকে প্রতিবছর স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা নবীজিকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসা এবং তাঁর পবিত্র আদর্শকে আঁকড়ে ধরা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে বোঝার ও আমল করার তওফিক দান করুন। আমিন।

মুহাম্মদ আল আমিন (এমএ)
সাংবাদিক, লেখক, কলামিস্ট ও ইসলামিক চিন্তাবিদ।

 

Comments (0...)

No comments yet

Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Your comment will be reviewed before being published.

Have an account? Sign in

Loading...

সর্বশেষ খবর

সোনারগাঁয়ে এশিয়ান হাইওয়েতে ২৫০ মিটারজুড়ে ভয়াবহ ফাটল, সড়ক দেবে চরম ভোগান্তি

সোনারগাঁয়ে এশিয়ান হাইওয়েতে ২৫০ মিটারজুড়ে ভয়াবহ ফাটল, সড়ক দেবে চরম ভোগান্তি

০৭ অক্টোবর, ২০২৬ - সকাল ৭:৩২ মি.
হজের যেকোনো একটি ফরজ বাদ পড়লে হজ বাতিল বলে গণ্য হবে, ক্ষতিপূরণে তা শুদ্ধ হবে না

হজের যেকোনো একটি ফরজ বাদ পড়লে হজ বাতিল বলে গণ্য হবে, ক্ষতিপূরণে তা শুদ্ধ হবে না

০৭ অক্টোবর, ২০২৬ - সকাল ৬:৪২ মি.
সোমবার ফজরে জীবনের সর্বশেষ দিয়ে মারা গেলেন মক্কার গ্রান্ড মসজিদের মুয়াজ্জিন |

সোমবার ফজরে জীবনের সর্বশেষ দিয়ে মারা গেলেন মক্কার গ্রান্ড মসজিদের মুয়াজ্জিন |

০৩ অক্টোবর, ২০২৬ - রাত ১১:৪৯ মি.
ডিএমপির ১১ পরিদর্শককে ঢাকার বাইরে বদলি

ডিএমপির ১১ পরিদর্শককে ঢাকার বাইরে বদলি

০৩ অক্টোবর, ২০২৬ - রাত ১১:৩২ মি.
সোনারগাঁয়ে রিসোর্ট থেকে সাবেক এমপি কায়সার হাসনাতের ভাই গ্রেপ্তার

সোনারগাঁয়ে রিসোর্ট থেকে সাবেক এমপি কায়সার হাসনাতের ভাই গ্রেপ্তার

০৩ অক্টোবর, ২০২৬ - রাত ১১:২৫ মি.
মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন হচ্ছে নতুন মার্কিন রণতরি, পাঠানো হচ্ছে ১০ হাজার সেনা

মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন হচ্ছে নতুন মার্কিন রণতরি, পাঠানো হচ্ছে ১০ হাজার সেনা

০৩ অক্টোবর, ২০২৬ - সকাল ৯:২৩ মি.
জামায়াত মুখে সহযোগিতা দেখালেও সরকারকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করছে, রাশেদ খাঁন

জামায়াত মুখে সহযোগিতা দেখালেও সরকারকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করছে, রাশেদ খাঁন

০৩ অক্টোবর, ২০২৬ - সকাল ৯:১১ মি.
ময়মনসিংহে বাস ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ, নারী-শিশুসহ, প্রাণ গেল ৭ জনের

ময়মনসিংহে বাস ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ, নারী-শিশুসহ, প্রাণ গেল ৭ জনের

০২ অক্টোবর, ২০২৬ - বিকেল ৩:২১ মি.
মডেল মসজিদে যুক্ত হলো খতিবের পদ, বাড়ল ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানী

মডেল মসজিদে যুক্ত হলো খতিবের পদ, বাড়ল ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানী

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ - সকাল ৯:৩৬ মি.
দেওবন্দি ভাবধারাই উম্মাহর ভারসাম্য, আলেমদের হাত ধরে সুদৃঢ় হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত দ্বীনি সম্পর্ক

দেওবন্দি ভাবধারাই উম্মাহর ভারসাম্য, আলেমদের হাত ধরে সুদৃঢ় হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত দ্বীনি সম্পর্ক

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ - সকাল ৯:০৪ মি.

সর্বাধিক পঠিত

১

রাশিয়া-ইউক্রেনের পাল্টাপাল্টি হামলায় একদিনে ২৬ জনের মৃত্যু

১,৩১২ বার পড়া হয়েছে
২

সোনারগাঁয়ে ওয়াজ মাহফিল চলাকালে অতর্কিত হামলা, চাপাতির কোপে আহত -২

১,১২৫ বার পড়া হয়েছে
৩

মেঘনার তীরে ভোরের হাঁকডাক, দেশি মাছের টানে ছুটে আসেন দূরদূরান্তের ক্রেতারা

৯৪৭ বার পড়া হয়েছে
৪

গোপালগঞ্জে ইমাম প্রশিক্ষণে শেখ হাসিনার প্রশংসা, জুলাই আন্দোলনকারীদের ফাঁসির হুমকির অভিযোগ

৭৭২ বার পড়া হয়েছে
৫

সোনারগাঁয়ে গৃহবধূ আনিকা হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন, জড়িতরা এখনো অধরা

৬৭৭ বার পড়া হয়েছে
৬

জাল সনদে ১৮ বছর চাকরি, কেয়ারটেকার সেলিমের বিদায়, এখন গ্রেপ্তারের দাবি

৬৫০ বার পড়া হয়েছে
৭

ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিনদের সতর্ক করল ইসলামিক ফাউন্ডেশন

৬৪৪ বার পড়া হয়েছে
৮

সৎ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, নারী সহকর্মীর নাম ব্যবহার করে ভুয়া অভিযোগ

৫৯৭ বার পড়া হয়েছে
৯

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নতুন মহাপরিচালক মহিবুল্লাহিল বাকী

৫৪৭ বার পড়া হয়েছে
১০

সংসদে প্রথমবার দাঁড়িয়েই সোনারগাঁয়ের সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরলেন এমপি মান্নান

৫৪৩ বার পড়া হয়েছে