মুহাম্মদ আল আমিন (এমএ) : মানুষ মাত্রই ভুলকারী। কখনো জেনে, কখনো না জেনে আমরা গুনাহ করে ফেলি। কিন্তু একজন মুমিনের সৌন্দর্য হলো-গুনাহের পর হতাশ না হয়ে দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তিগফার (আস্তাগফিরুল্লাহ পাঠ করা) ঈমানদারের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। কেবল পাপ মোচনের জন্যই নয়, বরং ইহকাল ও পরকালের অসংখ্য কল্যাণ ও বরকত লাভের সহজ উপায় হলো এই জিকির।
কোরআন, হাদিস এবং প্রখ্যাত বুজুর্গদের অভিজ্ঞতার আলোকে আস্তাগফিরুল্লাহ পাঠের ৬টি বিশেষ উপকারিতা ও ফজিলত নিচে আলোচনা করা হলো:
১. গুনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যম
আল্লাহ তাআলা বলেন-আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে—আর আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ ক্ষমা করবেন?-এবং তারা জেনে-বুঝে নিজেদের কৃতকর্মে অটল থাকে না। সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৫
অর্থাৎ ভুল হয়ে গেলে গুনাহের ওপর অটল না থেকে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই মুমিনের পথ। ইস্তিগফার সেই ফিরে আসার অন্যতম মাধ্যম।
২. রিজিক ও কল্যাণ বৃদ্ধির কারণ
ইস্তিগফারের সবচেয়ে আলোচিত ফজিলতগুলোর একটি হলো রিজিক ও পার্থিব কল্যাণের সঙ্গে এর সম্পর্ক।
হজরত নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন-তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দেবেন, তোমাদের জন্য উদ্যান সৃষ্টি করবেন এবং নদী-নালা প্রবাহিত করবেন। সূরা নুহ, ৭১:১০–১২
এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, ইস্তিগফার শুধু আখিরাতের মুক্তির জন্য নয়; আল্লাহর রহমতে দুনিয়ার কল্যাণ ও রিজিকের দরজাও এর মাধ্যমে খুলে যেতে পারে।
৩. বিপদ-আপদ ও সংকটে আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে যায়
ইস্তিগফার মানুষকে নিজের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করায় এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল করে। বান্দা যখন নিজের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, তখন সে আল্লাহর রহমতের আশ্রয় নেয়।
সূরা নুহের আয়াতগুলোতেই ইস্তিগফারের সঙ্গে বৃষ্টি, সম্পদ, সন্তান, বাগান ও নদীর মতো বিভিন্ন নিয়ামতের কথা এসেছে।
তাই জীবনে সংকট এলে শুধু দুশ্চিন্তায় ডুবে না থেকে তাওবা ও ইস্তিগফারে ফিরে আসা উচিত।
৪. অন্তরের ভার ও অপরাধবোধ থেকে মুক্তির পথ
গুনাহ মানুষের অন্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ইস্তিগফার সেই অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে। বান্দা যখন আন্তরিকভাবে বলে-আস্তাগফিরুল্লাহ, তখন সে মূলত স্বীকার করে, হে আল্লাহ আমি ভুল করেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।
তবে শুধু মুখে ইস্তিগফার বলাই যথেষ্ট নয়। সত্যিকারের তাওবার সঙ্গে গুনাহ পরিত্যাগের চেষ্টা এবং পুনরায় সেই গুনাহে না ফেরার সংকল্প থাকা উচিত।
৫. রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও নিয়মিত ইস্তিগফার করতেন
ইস্তিগফারের গুরুত্ব বোঝার জন্য এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে যে, আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেই নিয়মিত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-আল্লাহর কসম! আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে সত্তরের বেশি বার ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর কাছে তাওবা করি। সহিহ বুখারি, ৬৩০৭
অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি দিনে একশবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। এর মাধ্যমে আমাদের জন্য শিক্ষা হলো-ইস্তিগফার কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের আমল নয়; প্রত্যেক মুমিনের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হওয়া উচিত।
৬. ইস্তিগফারের শ্রেষ্ঠ দোয়া-সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইস্তিগফারের একটি বিশেষ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যাকে সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার বলা হয়। দোয়াটি হলো—
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আমার রব। আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আমি যথাসাধ্য আপনার সঙ্গে করা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির ওপর আছি। আমি যা করেছি তার অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আমার প্রতি আপনার নিয়ামত স্বীকার করছি এবং আমার গুনাহও স্বীকার করছি। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার কেউ নেই। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এই দোয়ার বিশেষ ফজিলত এসেছে।
ইস্তিগফারের গুরুত্ব বোঝাতে হাসান বসরী (রহ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বহুল প্রচলিত ঘটনা উল্লেখ করা হয়। বর্ণনাটি হলো-কেউ তাঁর কাছে অনাবৃষ্টি, কেউ দারিদ্র্য, কেউ সন্তান না হওয়ার মতো সমস্যার কথা বললে তিনি ইস্তিগফার করার পরামর্শ দিতেন। এরপর তিনি সূরা নুহের ১০–১২ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করতেন।
এই বর্ণনাটি কোরআনের ওই আয়াতগুলোর অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এটিকে সহিহ হাদিস হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়। বরং এটি হাসান বসরী (রহ.)-এর নামে প্রচলিত একটি শিক্ষামূলক বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করা উচিত।
এর মূল শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-জীবনের সংকটের সময়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, তাওবা করা এবং ইস্তিগফারে অভ্যস্ত হওয়া।
তাহলে প্রতিদিন কতবার আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ব?
ইস্তিগফারের জন্য একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা সবার জন্য বাধ্যতামূলক—এমন কথা বলা যাবে না। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে নিয়মিত ইস্তিগফার করেছেন এবং দিনে সত্তরের বেশি বার ক্ষমা চাওয়ার কথা সহিহ হাদিসে এসেছে।
তাই আমরা চাইলে নামাজের পর, সকাল-সন্ধ্যায়, ঘুমানোর আগে, কোনো ভুল হয়ে গেলে কিংবা অবসর সময়ে বেশি বেশি বলতে পারি- أَسْتَغْفِرُ اللهَ আস্তাগফিরুল্লাহ।
আর শুধু মুখে উচ্চারণ নয়-এর সঙ্গে অন্তরের অনুতাপ, গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই হওয়া উচিত প্রকৃত ইস্তিগফার।
ইস্তিগফার এমন এক আমল, যা মুখে হালকা কিন্তু মিযানের পাল্লায় ভারী। এটি এমন একটি চাবি, যা দিয়ে জীবনের প্রতিটি বন্ধ দরজা খোলা সম্ভব - রিযিক, শান্তি, সন্তান, সুস্থতা কিংবা আত্মিক প্রশান্তি। তাই আসুন, আমরা নিয়মিত জিহ্বাকে "আস্তাগফিরুল্লাহ" দিয়ে সিক্ত রাখি এবং আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে আসি।
اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنَا مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ
হে আল্লাহ, আমাদের তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।