নিজস্ব প্রতিবেদক: নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক নিদর্শন গোয়ালদি মসজিদ যথাযথ পরিচর্যার অভাবে ক্রমেই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পাঁচশ বছরের পুরোনো এই স্থাপনার দেয়ালের ইট ও আস্তরণ খসে পড়ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সূক্ষ্ম টেরাকোটা অলংকরণ। এমন করুণ পরিণতি দেখে হতাশ প্রকাশ করেছেন মসজিদ দেখতে আসা পর্যটকেরা।
পনেরো শতকে স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে নির্মিত এই মসজিদ পর্যটকদের কাছে সোনারগাঁয়ের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সুলতানি আমলের গৌরবোজ্জ্বল মুসলিম স্থাপত্যঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে বিবেচিত হয় এটি। ইতিহাস বলছে, ১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দে মোল্লা হিজবার আকবর খান এই মসজিদ নির্মাণ করেন। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে বাংলার শিক্ষা, শিল্প ও সাহিত্যে যে ব্যাপক উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিল, গোয়ালদি মসজিদ তারই একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।
এক গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদের চার কোণে রয়েছে সুলতানি রীতিতে নির্মিত চারটি টাওয়ার। মসজিদের ভেতরে-বাইরে ইট ও পাথরের ওপর দেখা যায় নানা নকশা ও কারুকাজসমৃদ্ধ আরব্য অলংকরণ। প্রায় ১ দশমিক ৬১ মিটার পুরুত্বের দেয়ালের পৃষ্ঠভাগে খোদাই করা রয়েছে নান্দনিক টেরাকোটা অলংকরণ, যা এই স্থাপনাকে দিয়েছে বিশেষ শৈল্পিক মর্যাদা।
১৯৭৫ সালে মসজিদটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এরপর বাংলাদেশ সরকার সামান্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারের মাধ্যমে এটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটি দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
সরেজমিনে দেখা যায়, দেয়ালের ইট ও আস্তরণ খুলে খুলে পড়ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে খোদাইকৃত টেরাকোটা অলংকরণ। দেয়ালের গায়ে জন্মেছে গাছ, লতা ও আগাছা। মূল ফটক তালাবদ্ধ থাকলেও ডান দিকের খিলানের গ্রিল খুলে পড়ে আছে। দেয়ালজুড়ে জমেছে শ্যাওলা, আর চারপাশে বেড়ে ওঠা ঘাস-লতাপাতায় স্থাপনাটি ধারণ করেছে এক ভুতুড়ে রূপ।
দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই ঐতিহাসিক এই স্থাপনার এমন করুণ পরিণতি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা ও সংশ্লিষ্টরা। সুলতানি আমলের এই গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আরও সক্রিয় ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অন্যথায় আগামী প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যেতে পারে বাংলার সুলতানি স্থাপত্যের এই অমূল্য স্মারক।