মুহাম্মদ আল আমিন, (এমএ) : মদিনার মসজিদে নববি থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক উহুদ পাহাড়। হিজরি তৃতীয় সনের শাওয়াল মাসে এই পাহাড়ের পাদদেশেই রচিত হয়েছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাবিধুর ও মহিমান্বিত এক অধ্যায়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর একটি কৌশলগত নির্দেশ অমান্য করার কারণে প্রায় নিশ্চিত বিজয়ের দুয়ার থেকে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায় কঠিন এক পরীক্ষার দিকে। রক্তরাঙা সেই প্রান্তরে নিথর হয়ে শুয়ে পড়েন ৭০ জন বীর সাহাবি-যাঁরা দ্বীনের সুরক্ষায় অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিলেন নিজেদের প্রাণ।
উহুদ যুদ্ধের এই কঠিন পরিস্থিতি ও সাহাবিদের ভুল থেকে শিক্ষার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন: আল্লাহ অবশ্যই তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছিলেন, যখন তোমরা তাঁর অনুমতিতে শত্রুদের হত্যা করছিলে; অবশেষে যখন তোমরা দুর্বলতা দেখালে, নির্দেশ নিয়ে মতবিরোধ করলে এবং যা তোমরা ভালোবাসতে তা দেখার পর অমান্য করলে। [সূরা আল-ইমরান: ১৫২]
পবিত্র কুরআনের এই বাণী স্পষ্ট মনে করিয়ে দেয় যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশের প্রতি অনুগত থাকাই মুমিনের বিজয়ের মূল চাবিকাঠি।
সেদিন যুদ্ধক্ষেত্রে সাহাবিদের আত্মত্যাগের চিত্র ছিল অভূতপূর্ব। ইসলামের প্রথম পতাকাবাহক হযরত মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) কাফেরদের আক্রমণ থেকে নবীজিকে রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হন। তাঁর চেহারার অবয়বে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিস্ময়কর সাদৃশ্য থাকায় চারদিকে হঠাৎ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, স্বয়ং নবীজি (সা.) শহীদ হয়েছেন। এই সংবাদে মুসলিম শিবিরে নেমে আসে তীব্র শোক ও বিভ্রান্তি। পরবর্তীতে এই সংবাদ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলেও যুদ্ধের তীব্রতায় প্রিয় নবীজি (সা.) নিজেও গুরুতর আহত হন।
অশ্রুসজল চোখে তিনি খুঁজে ফিরেছিলেন প্রিয় সাহাবিদের নিথর দেহ। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের প্রিয় চাচা হযরত হামজা (রা.)-এর নিথর দেহ দেখে গভীরভাবে শোকাহত হন এবং তাঁকে ‘সাইয়িদুশ শুহাদা’ বা শহীদদের সর্দার আখ্যা দেন।
সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, উহুদের শহীদদের কোনো গোসল দেওয়া হয়নি এবং তাঁদের রক্তমাখা পোশাকেই দাফন করা হয়েছিল। নবীজি (সা.) নির্দেশ দেন-যাঁদের বুকে কুরআনের জ্ঞান বেশি ছিল, দাফনে তাঁদের যেন আগে কবরস্থ করা হয়। শত শোক আর কায়িক কষ্টের মাঝেও পরম মমতায় নবীজি (সা.) নিজ হাতে ৭০ জন সাহাবির শেষ বিদায় সম্পন্ন করেন।
উহুদের শহীদদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন হযরত হানজালা ইবনে আবি আমির (রা.)। বিয়ের প্রথম রাতেই যুদ্ধের ডাক শুনে অপবিত্র (জানাবত) অবস্থায় গোসল করার সুযোগ না নিয়েই তিনি আল্লাহর পথে ছুটে যান এবং বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করেন।
যুদ্ধশেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জানান: আমি দেখেছি, আসমান ও জমিনের মাঝখানে রুপোর পাত্রে মেঘের পানি দিয়ে ফেরেশতারা হানজালাকে গোসল করাচ্ছেন।
পরিবারের কাছে খোঁজ নিয়ে সাহাবিরা নিশ্চিত হন, তিনি সত্যিই গোসল না করেই জিহাদে অংশ নিয়েছিলেন। এই অলৌকিক ঘটনার পর থেকেই তিনি ইতিহাসে পরিচিতি পান ‘গাসিলুল মালায়িকা’ বা ‘ফেরেশতাদের দ্বারা গোসলপ্রাপ্ত সাহাবি’ নামে।
উহুদের ৭০ শহীদের ঐতিহাসিক তালিকা
সিরাত-বিশেষজ্ঞদের মতে উহুদে শহীদ সাহাবির সংখ্যা সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য হিসাবে সত্তর জন। সিরাতে ইবনে হিশামে সংরক্ষিত ইবনে ইসহাকের 'আল-মাগাযি' অনুসরণে শ্রেণিভিত্তিক তালিকা নিম্নরূপ:
১. মুহাজির সাহাবি (৭ জন)
হযরত হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব (সাইয়িদুশ শুহাদা)
হযরত মুসআব ইবনে উমাইর
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ
হযরত শাম্মাস ইবনে উসমান
হযরত খুনাইস ইবনে হুযাফা
হযরত হারিছ ইবনে উকবা
হযরত ওয়াহব ইবনে কাবুস
২. আনসার সাহাবি- আউস গোত্র (২৮ জন)
হযরত হানযালা ইবনে আবি আমির (গাসিলুল মালাইকা)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (তীরন্দাজ দলের প্রধান)
হযরত আবু সুফিয়ান ইবনে হারিছ
হযরত আবু হাইয়া ইবনে আমর
হযরত আনিস ইবনে কাতাদা
হযরত আল-উসাইরিম
হযরত ইয়াস ইবনে আউস
হযরত হারিছ ইবনে আনাস
হযরত হারিছ ইবনে আউস
হযরত ছালাবা ইবনে হাতিব
হযরত জানাব ইবনে কায়যি
হযরত হাবিব ইবনে যায়েদ
হযরত খাদ্দাশ ইবনে কাতাদা
হযরত খিছামা ইবনে হারিছ ও তাঁর মিত্র আবদুল্লাহ
হযরত রাফাআ ইবনে আবদুল মুনযির
হযরত যায়েদ ইবনে হাতিব
হযরত সুবাই ইবনে হাতিব ও তাঁর মিত্র মালিক
হযরত সালামা ইবনে ছাবিত
হযরত সাইফি ইবনে কায়যি
হযরত উবাদা ইবনে সাহল
হযরত উবাইদ ইবনে তাইহান
হযরত উমারা ইবনে যিয়াদ
হযরত আমর ইবনে ছাবিত
হযরত আমর ইবনে মুআয
হযরত উমাইর ইবনে আদি
হযরত আউফ ইবনে আমর
হযরত মালিক ইবনে উমাইয়া
হযরত আল-ইয়ামান ইবনে জাবির
৩. আনসার সাহাবি - খাযরাজ গোত্র (৩৭ জন)
হযরত আনাস ইবনে নাদর
হযরত সাদ ইবনে রবী
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম
হযরত আমর ইবনে জামুহ ও তাঁর সেবক আসির
হযরত মালিক ইবনে সিনান
হযরত আবু হুবাইরা ইবনে হারিছ
হযরত আউস ইবনে আরকাম
হযরত আউস ইবনে ছাবিত
হযরত ইয়াস ইবনে আদি
হযরত মুজাযযির ইবনে যিয়াদ
হযরত নুমান ইবনে মালিক
হযরত ছাবিত ইবনে আমর
হযরত ছালাবা ইবনে সাদ
হযরত ছাকাফ ইবনে ফারওয়া
হযরত খারিজা ইবনে যায়েদ
হযরত খাল্লাদ ইবনে আমর
হযরত যাকওয়ান ইবনে আবদ কায়স
হযরত রাফি ইবনে মালিক
হযরত রাফাআ ইবনে আমর
হযরত সাঈদ ইবনে সুওয়াইদ
হযরত সুলাইম ইবনে হারিছ
হযরত সুলাইম ইবনে আমর ও তাঁর সেবক আনতারা
হযরত সুহাইল ইবনে কায়স
হযরত দামরা আল-জুহানি
হযরত আমির ইবনে মুখলিদ
হযরত উবাদা ইবনে হাশহাশ
হযরত আব্বাস ইবনে উবাদা
হযরত উবাইদ ইবনে মুআল্লা
হযরত উতবা ইবনে রবী
হযরত আমর ইবনে ইয়াস
হযরত আমর ইবনে মুতাররিফ
হযরত আমর ইবনে কায়স ও তাঁর পুত্র কায়স
হযরত কায়স ইবনে মুখলিদ
হযরত কায়সান (বনু নাজ্জারের মুক্ত দাস)
হযরত মালিক ইবনে ইয়াস
হযরত নুমান ইবনে আবদ আমর
হযরত নওফল ইবনে আবদুল্লাহ
(দ্রষ্টব্য: প্রথা অনুযায়ী সকল সাহাবির নামের সাথে "রাদিয়াল্লাহু আনহু" সংযুক্ত বলে গণ্য।)
উহুদের রক্তস্নাত মাটি কেবল এক বেদনাময় ইতিহাস নয়; বরং তা মুমিনের পরম ঈমান, ত্যাগ ও বিশ্বস্ততার প্রতীক। সূরা আলে ইমরানের ১৬৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন: আর যাঁরা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছেন, তাঁদের মৃত মনে করো না; বরং তাঁরা তাঁদের রবের নিকট জীবিত, জীবিকাপ্রাপ্ত।
-[সূরা আল-ইমরান: ১৬৯]
নবীজি (সা.)-এর নির্দেশের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য বজায় রাখা এবং দ্বীনের প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগে প্রস্তুত থাকাই উহুদ যুদ্ধের মূল বার্তা, যা প্রতিটি মুমিনের অন্তরে যুগে যুগে প্রেরণার মিনার হয়ে বেঁচে থাকবে।